শিরোনামবাবা দিবসের লেখা
পরিবারের কারো নম্বর থেকে টানা অনেকগুলো কল এলে আমি আঁৎকে উঠি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলো কি না! কাউকে হারিয়ে ফেললাম কি না! কয়েকমাস আগে এক বিকালে ঘুমিয়েছিলাম। জেগে দেখি ৩০/৩৫টা কল এসেছে। মোবাইল ছিলো সাইলেন্ট মুডে। তাই কোন টের পাইনি। জেগে খুব আতংক নিয়ে কল দিলাম। ঘুমানোর এক্সকিউজ দিয়ে নিলাম আগেই। এরপর জানতে পারলাম, আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বমি করেছেন কয়েকবার। খুব ঘামাচ্ছেন। অনেক খারাপ অবস্থা। আমি খুব কান্না করলাম।
একটা ভয় চেপে বসলো। আব্বা থাকবেন তো! নামাজ পড়ে খুব কেঁদে কেঁদে আব্বার সুস্থতার জন্য দোয়া করলাম। আল্লাহর কাছে তাঁর নেক হায়াত চাইলাম। আল্লাহ দয়া করলেন। ঐদিনই আব্বা সুস্থ হয়ে উঠলেন। ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বরিশাল নিয়ে আসলেন ভাইয়েরা। রিপোর্টে গুরুতর কোনো সমস্যা নেই। আমি নির্ভার হলাম। আসলে আমাদের পরিবারে কারোই তেমন বড় কোনো অসুখ-বিসুখ হয়নি কখনো। তাই আচমকা এমন কিছু ঘটলে ভয় পেয়ে যাই। তার ওপর আব্বা সত্তরোর্ধ মানুষ। এ বয়সী মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ জন্য ভয়টা স্বভাবতই একটু বেশি কাজ করে।
২০০০ সালের কথা। আমায় প্রাইমারিতে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো আব্বা তখন পিটিআইতে। পটুয়াখালী শহরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ক’দিন পরপরই চিঠি পাঠান। আব্বা যখন পাঠান, তখন চিঠি হয় একটা। আর আমার মা যখন আব্বাকে পাঠান, তখন হয় কয়েকটা। মায়ের নিজের একটা। সাথে আমাদের প্রত্যেক ভাই বোনের একটি করে। আমি সবার ছোট। আমাকেও লিখতে হতো। মা বলতেন আর আমি তাঁর কথা মতো ছোট-বড় বর্ণে লিখতাম দুই পৃষ্ঠার এক চিঠি।
১৮ বছর আগের কথা। প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে, আমি প্রথম চিঠি লিখেছিলাম ২০০০ সালে। বাবার কাছে লিখেছিলাম। গতবার আব্বার ট্রাঙ্ক খুলেছিলাম। তখন পেলাম এই চিঠিগুলো। বের করে দেখলাম আমারও চিঠি আছে। আমার হাতে লেখা.......! আব্বা এগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আমার চিঠিতে লেখা ছিলো, ‘‘আব্বা তুমি আসো না। আমায় তো ভুলেই গেছো।’’ এমন আরো কত কথা! এগুলো মা আমায় লিখতে বলেছিলেন। মায়ের কয়েকটা চিঠিও পড়লাম। মা আবেগ দিয়ে কতকিছু লিখেছেন! লিখেছেন, স্বামীর অবর্তমানে সন্তান-সংসার দেখার গুরুদায়িত্ব পালনে হিমশিম খেয়ে যাবার কথা। আরো অনেক কথা।
সত্যি বলতে চিঠির চর্চাটা আমাদের বাড়িতে খুব হতো। চিঠিপত্রের কাল তখনো ফুরোয়নি। সমাজের ২/৪ জন উচ্চবিত্ত মানুষ ছাড়া সবাই যোগাযোগের মাধ্যম বলতে বুঝতো চিঠি। আমাদের পাড়ায় নিরক্ষর মানুষের অন্ত ছিলো না। জমি বেচা-কেনা আর বিবাহ-শাদীর মতো কাজ তাঁরা টিপসই দিয়েই চালিয়ে দিতো। লেখাপড়া না জানা এই মানুষগুলোকেও তো দূরদেশের আত্নীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে হতো। নিজেরা পারছেন না। ছুটে আসতেন লেখাপড়া জানলেওয়ালা মানুষদের কাছে। মানুষগুলো খুব আগ্রহ আর আশা নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতেন, ঐ বাড়িতে গেলে একটা সমাধান হবেই।
আব্বা আর মা দুজনই মেট্রিক পাস। কেউ এলে, এদেরকে খুব সাহায্য করতেন। কেউ কাগজ আনতে ভুলে গেলে আমাদের হাতের লেখার খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তাঁদেরকে চিঠি লিখে দিতেন। লোকটা পাশে বসে বলছেন তাঁর মতো করে আর এদিকে আব্বা অথবা মা তা চিঠির ভাষায় লিখছেন। ডাকপিয়ন যদি কোনো চিঠি দিয়ে যেতো। দৌঁড়ে চলে আসতেন আমাদের বাড়ি। মা-আব্বা পড়তেন। পাশে বসে তিনি বা তাঁরা শুনতেন। আনন্দের কথায় মিটিমিটি হাসতেন আবার কষ্ট বা বেদনার কথায় চোখে জল নেমে আসতো। সেসব দৃশ্য আমার চোখের সামনে এখনো ভাসছে।
আব্বা সকালে বের হতেন। সারাদিন মাস্টারি করে বিকালে ফিরতেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বাজারে গেলে ফিরতেন রাত ৮/৯ টায়। খেয়েদেয়ে ঘুম। সকালে উঠে আবার আগের দিনের মতো। তাঁর রুটিনে আমাদের পড়াশোনায় নজর বা শাসনের জন্য তেমন কোনো সময় ছিলো না। এসব দেখতেন মা। আব্বা সাধ্যমতো পড়াশোনার জিনিসপত্র কিনে দিতেন। পড়া ভালমত পারতে যতটুকু মাইর লাগতো, তা মা একাই সামাল দিতেন। আব্বা কিছুই বলতেন না। তাই মা মারতে শুরু করলে আব্বার আড়ালে পালাতে পারলেই রক্ষা পাওয়া যেতো। আর আমার কোনো দুষ্টুমি হাইলাইট হলে ব্লেম গেম ভালোই জমতো। আব্বা বলতেন, তোমার পোলা এটা করেছে। মা বলতেন, তোমার পোলা এটা করেছে। আমি ভাবতাম, আসলে আমি কার পোলা! মায়ের নাকি আব্বার! হা হা হা।
আব্বার নাম হাই। হাই ফরায়েজি। আমার স্কুলের শফিক স্যার আব্বার খুব পরিচিত ছিলেন। ইংরেজিতে হাই মানে উঁচু, তাই স্যার আমায় রসিকতা করে বলতেন ‘উঁচা ফরাজির পোলা’। আব্বার চেহারার সাথে আমার বেশ মিল আছে নাকি। এলাকার মুরুব্বিরা, যারা আমায় কখনো দেখেনি, তাঁরাও চেহারা দেখে বলে, ‘‘এ মেয়া, তুমি কি ফরাজি সাবের পোলা!’’ আমি হেসে দিয়ে বলি কেমনে বুঝলেন? বলেন, চেহারায় মিল আছে ব্যাটা। বিষয়টা আমি খুব উপভোগ করি।
একজন প্রাইমারি স্কুল মাস্টারের পক্ষে সাত সাতটি সন্তানকে ন্যূনতম ইন্টারমিডিয়েট পাস করানো খুব সহজ কথা না। এর মধ্যে চারজন আবার পোস্ট গ্রাজুয়েট। আমার আব্বা পেরেছেন। আমার মায়ের সাহচর্যে আব্বা এমন কঠিনকেও সহজ করে তুলেছেন। অল্প কয় টাকা যা মাইনে পেতেন, তা দিয়ে এতগুলো মানুষের চাহিদা মেটানোর পর নিজের শখের পরিচর্যা আর করা হতো না। তাঁর এই ত্যাগ ছিলো বলেই আজ আমরা এমন। বাবার অনেক একরোখা অভ্যাস আছে। আমার সাথে অনেকক্ষেত্রে তাঁর মতের অমিল হয়। আমার অনেক বায়না তাঁর কাছে উপেক্ষিত হয়। তাঁকে নিয়ে আমার শত অভিযোগ আছে,স্বীকার করি। তবুও চাই বাবা থাকুক আমার চোখের সামনে। থাকুক আমার মাথায় ছাদ হয়ে।
এই পৃথিবী চিরকাল বেঁচে থাকার জায়গা না। যেখানে পৃথিবী নিজেই চিরন্তন না সেখানে আমরা কাকে পুঁজি করে চিরকাল বাঁচার সাধ পুষবো! বাবার বয়স হয়েছে মানি, তবুও চাই তিনি বেঁচে থাকুক আরো কয়েক যুগ। সুস্থ থাকুক আব্বা। নিজ চোখে দেখুক, তাঁর সন্তানগুলো কত সুখে থাকতে পারে! এ সমাজের বাচ্চাগুলো মায়ের কাছে বেশি সময় থাকে বলে প্রচণ্ড মা ভক্ত হয় তবে বাবার জায়গাটা মনের অজান্তেই কেমন যেন সংকুচিত করে ফেলে। হাদিসে মায়ের গুরুত্ব বাবার চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেখানো হয়েছে, তাও বিশ্বাস করি। বাবার জন্যও একটা বিশাল জায়গা আমাদের ধারণ করা উচিৎ। মায়ের অবদান আর ত্যাগের মাঝে বাবাকে হারিয়ে না ফেলে, এর মধ্যে খুঁজে বেড়ালেই একজন পিতার পিতৃত্ব সার্থক হয়। আমি এটাই করার চেষ্টা করি।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????