Bangla Runner

ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১ | বাংলা

শিরোনাম

মানুষের হাড়, খুলি, কঙ্কালে তৈরি হয়েছে যে গীর্জা কান্নার গল্প রেখে গেলেন হাসির বিজ্ঞাপনের মাসুদ আল মাহদী অপু মানুষ থেকে পাথর হয়ে যাচ্ছে এক শিশু নিয়মিত সাহিত্যবিষয়ক লেখা প্রকাশ করছে দূর্বাঘাস ত্বকী: একটি বিচারহীনতার প্রতীক পার্কের দাম একটি আস্ত শহরের চেয়েও বেশি! বঙ্গবন্ধুর মননে পিছিয়ে পড়া মানুষ নীতিতে আপোষহীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শতবর্ষে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ঢাবি আলাদিনের প্রদীপে ভয়ঙ্কর ফাঁদ
Home / গল্প

ছোটগল্প:

আলোকশিখা

রেজওয়ানা শারমিন রীতি
শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১ Print


রাঙামাটির পার্বত্য অঞ্চল। এখানকার পরিবেশ খুবই নিরিবিলি, ঢাকার মত ব্যস্ত শহর থেকে আসা মানুষের কাছে এটা যেন একটা পরম শান্তির জায়গা। তবে এখানে থাকার ব্যবস্থা ঢাকার মত অত সুবিধাজনক নয়। তাই চাকুরিজীবিদের নাকি শাস্তি হিসেবে এখানে বদলি করে। আমি অবশ্য স্বেচ্ছায়ই এখানে পোস্টিং নিয়ে এসেছি। হাস্যকর হলেও সত্য যে, সংসার ধর্মের প্রতি এখনো মনোযোগ আসেনি। পিছুটান ছাড়া মুক্ত হয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার শখ আমার। মা অবশ্য হাল ছাড়েননি। আমাকে সংসারী করার পুরো  চেষ্টাই বাড়িতে চলছে। তবে কাউকে যে কখনো জীবনসঙ্গী হিসেবে ভালো লাগেনি তা বলব না।

থাক ওসব অতীতের কথা। আজ অফিসে যেতে একটু দেরি হয়ে গেল। এতটা তাড়াহুড়ো করে আমি এর আগে কখনো অফিসে যাইনি। আসার পথে দেখলাম রাস্তা দিয়ে একদল হাই-স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে হাতে ‌‘সাহায্যের আবেদন’ লেখা বক্স নিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে। এ জায়গায় আমি এসেছি প্রায় এক বছরের মত হতে চলেছে। কিন্তু এই প্রথম এমন সাহায্যের আবেদন বক্স নিয়ে যেতে দেখলাম। দেখে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়ে গেল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা বন্ধুদের বা তাদের পরিবারের মানুষের সাহায্যের জন্য এমন করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বিত্তবানদের কাছ থেকে টাকা তোলে। আমি নিজেও অনেক করেছি। প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই শুনলাম অর্থনীতি বিভাগের এক বন্ধুর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। বন্ধুরা মিলে গ্রুপ করে নেমে পড়লাম টাকা তুলতে। বই মেলায় যাওয়ার রাস্তায়, বাংলা একাডেমির সামানে, শাহবাগের রাস্তায়, বসুন্ধরা শপিংমলের সামনে, শিক্ষকদের কাছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিজীবি বড় ভাইদের কাছে। শেষ পর্যন্ত বন্ধুটিকে বাঁচাতে পারিনি।

এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বছর কতজনের চিকিৎসার খরচ তুলতে কতভাবে বন্ধুরা মিলে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি, সাহায্যের হাত পেতেছি। একবার এক বয়স্ক লোক বলেছিল, ‘তোমরা এই বয়সে বন্ধুর জন্য যেই কাজ করছ, আমরা হয়ত লজ্জা পেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তা করতে পারতাম না। তোমাদের জন্য অনেক দোয়া রইল, সফল হও।’ তার কথা শুনে উদ্যমতা আরো বেড়ে গেল।

তখন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে শিখা নামের বন্ধুটি ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত। প্রতিবাদীও ছিল খুব। সদা হাস্যজ্জ্বল ছিল তার মুখখানি, আগুনের শিখার মতই ছিল তেজদীপ্ত। সূর্যের শিখার মত সকলকে আলোকিত করে রাখতে চাইত ও।  বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিতদের। যখন ও খুশি হত তখন চাঁদের আলোর মত জ্যোতি ছড়াত ওর চেহারায়। তবে তা নাকি শুধু আমার কাছেই মনে হত আর বাকি ছেলে বন্ধুরা তা নিয়ে হাসত। থাক সেসব অতিতের কথা। কত স্মৃতি বিস্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যায়। কতটা আবার ভুলে যাওয়ার ভান করে নিজের সাথেই লুকোচুরি করি।

ঢাকায় সাহায্যের আবেদনের জন্য যতটা মানুষ দেখা যায় এই পার্বত্য অঞ্চলে এই ধরাণের কাজ করতে তেমন দেখা যায় না। তাই একটু বিস্মিত হয়ে গাড়িটা ওদের সামনে দাঁড়াতে বললাম। ওদের জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ওদের স্কুলের এক শিক্ষিকার ব্লাড ক্যান্সার। তার চিকিৎসার জন্য টাকা তোলা হচ্ছে। পকেট থেকে পাঁচশ টাকা বের করে ওদের দিতে গিয়ে বক্সের গায়ে যে ছবিটা দেখলাম তাতে আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কোন রকমে টাকাটা বক্সে ফেলে ড্রাইভারকে বলতেই তিনি অফিসে ছুটে গেলেন।

আজ এমনিতেই অফিসে দেরি করে আসা কিন্তু তারপরেও কিছুতেই কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। বক্সের ওপরে দেখা ছবিটা আমার মনের ভেতর শুধু ঝড় তুলছে। চেহারায়ও নাকি তার ছাপ পড়েছে বলল অফিসের অন্য কর্মকর্তারা। শরীর খারাপের কথা বলে বাসায় ফিরে আসলাম। এসেই ধুপ করে ব্যাগটা রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এতক্ষনে আমার অতীত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ কেমন চেহারা দেখলাম আমার শিখার! কথাটা বলে নিজেই হাসলাম।

এক সময় ওকে বলতাম তুমি শুধু আমার জীবনের শিখা। আমাকে এভাবেই আলোকিত রেখ সারাজীবন। সবকিছুতেই পারদর্শী ছিল আমার শিখা। নাচ, গান, কবিতা, কাউকে সাহায্যের জন্য ছুটে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া এসব নিয়েই ছিল। পড়াশোনাতেও ভালই ছিল। টপ লেভেলের ছিল না কিন্তু আমার চেয়ে অনেক ভাল। প্রথম বর্ষে এসেই ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। সব বন্ধুদের মতই ওর সাথেও গল্প হত। আমাদের দুজনের ভাল লাগা মিলে যেতে দেখে দুজনের গল্পের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। এরপর ওকে অন্য বন্ধুদের চেয়ে একটু আলাদা ভাবা। দুজন মিলে কত স্বপ্ন দেখা।

তবে শিখার সব সময়ই একটু আক্ষেপ ছিল যেন বাকিদের মত করে আমিও ওকে প্রপোজ করি ঘটা করে। আমি বলতাম, সকলের ভালবাসা প্রকাশের ধরন এক রকম না। যারা ওমন করে তাদের ভালবাসা স্থায়ী হয় না। কিন্তু আমাদেরটা স্থায়ী হবে। শুনে ও শুধু হাসত। এমন আরো কত স্মৃতি ছিল আমাদের। আমরা কেউ কারো অতীত নিয়ে কখনো কথা বলতাম না। বর্তমান নিয়েই শুধু মেতে ছিলাম।

যখন আমরা অনার্স ফাইনাল ইয়ারে তখন আমি মাকে শিখার কথা বলি। পরিবারের সবার চেয়ে আমি মায়ের সাথেই বেশি ফ্রি। আমার সব আবদার থাকে মায়ের কাছে। তবে বন্ধুরা হেসে বলত, আমি নাকি মায়ের কথা ছাড়া উঠিও না, বসিও না। হয়ত কথাটা সত্যিও কারণ আমার জীবনের সকল সিদ্ধান্ত আমার মা-ই নিয়েছেন। তবে আমি নিজে আমার জীবনসঙ্গী পছন্দ করব তা-যে মায়ের তেমন পছন্দ হবে না তা আমি বুঝতে পারিনি।

মাকে বলার চারমাস পেরোতেই মা একদিন ফোন করে শিখার সাথে আমাকে মিশতে নিষেধ করে দেয়। মা যে এর মধ্যে ওর গ্রামে গিয়ে ওর সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছিল তা আমি জানতাম না। হাই-স্কুলে থাকতে কিছু বখাটের উত্ত্যক্ত করাকে শিখা প্রতিবাদ করায় এবং ওদের জেলে পাঠানোর কারণে ছেলেগুলো ফিরে এসে শিখাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পাঁচদিন পরে বিধ্বস্ত অবস্থায় ওকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায়।

মা কখনোই ওকে বউ  হিসেবে গ্রহণ করবে না তা জানিয়ে দিল। আমি মায়ের সঙ্গে তর্ক করি, এতে ওর কোন দোষ ছিল না। কিন্তু নিজে পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। এরপর থেকেই শিখার প্রতি আমার আচরণ নাকি বদলে যায়। ও শুধু বলত আমি নাকি এখন আর ওকে বুঝতে পারি না। ছেলে বন্ধুদের সাথে ওর হাসাহাসি তারপর থেকে আমার অসহ্য লাগতে থাকে।

ওর এতটা উদার হতে চাওয়া, অন্যকে সাহায্যের জন্য দৌঁড়ানো আমার কাছে অতিরিক্ততা মনে হতে থাকে। মাঝে মাঝেই আমাদের অনেক বেশি ঝগড়া হত। যে দিন পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেব সেদিন আমি শিখাকে ডেকে বলেছিলাম, ‘আমাদের চিন্তা-চেতনায় এখন বিস্তর ফারাক। এভাবে আর চলা যায় না। তুমি তোমর মত করে সুখী হও’। শিখা শুধু বলেছিল, ‘আমি তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকব’।

এরপর চারটা বছর কেটে গেল ওর কোন খোঁজ রাখিনি। প্রথমে অনেক খারাপ লাগত কিন্তু পরে চাকরি পাওয়ার নেশায় ছুটতে ছুটতে এখন আমি কৃষি অফিসার হিসেবে রাঙামাটিতে আছি। স্মৃতিচারণের ঘোর কাটতেই শিখাকে খুঁজতে যাওয়ার ঝোক চাপল। কোন রকমে গোসল খাওয়া শেষে বেড়িয়ে পড়লাম শিখার সন্ধানে। স্কুল থেকে ওর এই চার বছরের ইতিহাস জানলাম। তারপর ঠিকানা নিয়ে হাসপাতালে দেখতে গেলাম।

একি চেহারা হয়েছে ওর! সেই ঘন কালো চুল এখন মাথায় নেই বললেই চলে। চেহারায় পুরো রুগ্নতার ছাপ। আমাকে দেখে যে ও নিজেও খুব বিস্মৃত হয়েছে তা মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর হাতটা ধরতেই ওর দুচোখ বেয়ে অশ্রুর ফোয়ারা ছুটল। কথা বলতে পারছিল না ঠিক মত। তাবু ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলল, তোমায় দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কে যেন আমার কণ্ঠ চেপে রেখে দিয়েছে যা দিয়ে কোন শব্দ বের হবে না।

আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। মেয়েটা যে আমার জন্য সত্যিই অপেক্ষা করবে তা আমি কখনোই বুঝিনি। ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, ওর ক্যান্সার এখন লাস্ট স্টেজে আছে। বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবুও ওর ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী সবার কাছে ও এতটাই প্রিয় যে সবাই অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে ওকে আজ বিদেশে পাঠাচ্ছে উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু হয়ত আর জীবিত ফিরে আসবে না। আমার মধ্যে তখন অনুশোচনা আর কষ্টের আন্দোলন চলছে।

হঠাৎ কল বেজে উঠতেই চমকে ফোনটা ধরলাম। আমার কণ্ঠ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। মায়ের কল। রিসিভ করতেই ধমকের স্বরে মা বললেন দু’দিন পরে যার বিয়ে সে এখনো অফিসে কেন? এখন বাড়িতে রওনা কর। আমি কিছু না বলে কলটা কেটে দিয়ে সামনে পা বাড়ালাম। আর মনে মনে বললাম আমার শিখা সব সময়ই সবার কাছে অনেক প্রিয় ছিল...।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2021 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon