আজ ১২ বছর হল। রাফু মিয়া মালেয়শিয়ার পেনাং এর এক হোটেলে বৈধভাবেই কাজ করছেন। পরিচিত এক বাংলাদেশী হোটেলের ম্যানেজার হওয়ায় বিশেষ আতিথেয়তা পাচ্ছিলেন রহমান সাহেব। প্রায়ই বিদেশ যাত্রার অভ্যাস আছে তার। তবে যেহেতু পরিচিত লোকের হোটেল তাই কৃত্রিমতা ছেড়ে দেশী লাটসাহেবের বেশেই তিনি থাকছেন।
রাফু মিয়াকে ডাকলেন লাগেজ বহন করতে। নির্দেশনা মানতে নড়চড় হওয়ায় এমন বকুনি দিলেন আশাপাশের ভিনদেশীরাও হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তারপরও রাফু মিয়া কোনরকম বাদানুবাদ না করে হাসিমুখে কাজ করে গেলেন। কারণ সমাজের জন্য নিম্ন আয়ের মানুষের উপর তথাকথিত ভদ্রলোকদের রক্ত চাহনি দেয়াটাই রোজকার ঘটনা।
কিন্তু পরে রহমান সাহেব অন্য কর্মচারী মারফত জানতে পারলেন যে, গত সপ্তাহে রাফু মিয়ার একমাত্র কন্যা হঠাৎ হয়ে মারা গেছে। তবুও দেশে যাওয়ার সুযোগটুকু রাফু মিয়ার হয় নাই। আদরের কন্যার সাথে শেষ দেখাটা হল না। বুকে পাহাড়সম কষ্ট নিয়ে তাই বাকি সন্তানগুলোর কথা ভেবে চাইলেও চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরতে পারেননি।
আমাদের প্রবাসী শ্রমিকগণ এভাবেই দিন পার করে আসছেন। আর আমাদের তেমন ভাবার সময় নেই। ধরুন আপনি বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে দেখবেন অনেক নিম্নবিত্তের মানুষ অপেক্ষমান। তারা কেউ হয়ত একটু স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অথবা অপমান অপদস্তের ও নানা রকম অপ্রাপ্তির বিষাদাগার নিয়ে আপনজনের সান্নিধ্যে যেতে দেশে ফিরছেন। আর যদি আপনার গন্তব্য মালেয়শিয়া সিংগাপুর মধ্যপ্রাচ্য হয় তবে ওসব দেশে গিয়েও তাদের দেখা পাবেন।
এবার ভাবুন তো ক’জন মানুষ তাদের সাথে আন্তরিক ভাবে কথা বলে? না বিদেশিদের কথা বলছি না বাংলাদেশী কেতাদুরস্তদের কথাই বলছি। সামান্য সম্মানটুকু যারা আমাদের কাছে পাচ্ছে না তারাই কিন্তু আমাদের অর্থনীতির বৃহৎ খাত রেমিট্যান্সের কান্ডারী। তাদের শ্রমে যে এদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। শুধু তাই নয়, দু’বাহুর অক্লান্ত শ্রমে তৈরী হয়েছে স্কাইস্ক্র্যাপার সমৃদ্ধ কুয়ালালামপুর দুবাইয়ের মত বিলাসবহুল শহরগুলো। যেগুলো দুই-তিন দশক আগেও সাদামাটা শহর ছিলো।
ভাবুন তো যেসব দালান শ্রমিকেরা নিজ হাতে বানিয়েছে সেসব সুউচ্চ রম্য অট্টালিকায় এই মানুষগুলোর আজ প্রবেশাধিকার টুকু আছে কি? না নেই। সেখানে কেবল ধনকুবেরদের বিলাসিতার অধিকার আছে।
আমাদের দেশেই বা আমরা শ্রমিকদের কতটুকু সম্মান দেই? তাদের জীবন তো আমাদের কাছে নেহাৎ তুচ্ছ মামুলি ব্যাপার। বিদেশের কোন সুপারশপ বা ব্র্যান্ডের কাপড় কিনতে যেয়ে যদি “Made in Bangladesh” লেখা দেখেন তাতে গর্বিত হওয়ার অধিকার কি আপনার আমার আছে? সেই ট্যাগের উপরই তো কতশত পোষাক শ্রমিকের রক্ত, জীবনের অনিশ্চয়তা, যৌন নিপীড়নের কালিমা লেগে আছে।
এসব মানুষগুলোর শ্রমের বিনিময়েই আমরা আমাদের দেশ নিয়ে গর্ব করার অধিকারটুকু পাচ্ছি। অথচ তাদের সম্মান দিতে জানি না। কারণ ‘সব পেশাকে সমান সম্মান’র বিষয়টুকু পুঁথিবিদ্যায় আয়ত্ত্ব করলেও আমরা বাস্তবতায় প্রয়োগে বিশ্বাসী নই। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের কিশোরী কন্যা সাশা যখন কফিশপে কাজ করে সেই খবরে আমরা বিস্মিত হই! অথচ আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরাই এসব কাজের মাধ্যমে উপার্জন করতে সমাজের ভয়ে দ্বিধান্বিত হয়। অদৃশ্য এক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের চক্রে আমরা বাধা পড়েছি।
আবার আমাদের দেশের উচ্চবিত্ত,মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরাই অনেকে নির্দ্বিধায় বিদেশে কাজ করে চলেছে। কারণ উন্নত দেশের মানুষের মানসিকতা ও অনেক ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে উন্নত। যতদিন না আমাদের সমাজ এ অদৃশ্য চক্র থেকে বেড়িয়ে না আসবে ততদিন এ বৈষম্য বিরাজ করবেই। শ্রমিকের রক্তঘাম মাখা কায়িক শ্রমগুলোকে আমরা যতদিন না যথাযথ সম্মান দিতে পারব ততদিন হয়ত উন্নত সমাজের কাতারে আমাদের ধরা হবেনা।
লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।।