পলাশীর অন্যপাঠ:
পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসের যে দিক পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা সেটি নিয়ে কোন তরফে (জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ অথবা ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ) সন্দেহ নেই। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ এবং যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতির সকল তথ্য নৈর্ব্যক্তিক ভাবে সংগৃহীত হয়েছে কিন্তু এগুলোর ব্যাখ্যা বিভিন্ন মহল বিভিন্ন ভাবে করার চেষ্টা করে থাকেন। আজকের ইতিহাসের পাতায় আমরা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো যেমন পলাশীর যুদ্ধের ‘নায়ক’ কি বাংলার তৎকালীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ‘খলনায়ক’ কি মীরজাফর ও গং কিংবা ইংরেজরা? অথবা মীরজাফরকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা বিগত ইতিহাস কতটুকু সমর্থন করে? কিংবা সিরাজের পরাজয় কি বাংলা ও বাঙালির পরাজয় বলা যাবে কিনা!
ইতিহাস: পলাশীর ইতিহাস মোটামুটি আমাদের সকলের জানা। পলাশীর যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে ২৩ জুন, ১৭৫৭। কিন্তু এ-যুদ্ধের বীজ আসলে বপন করে গিয়েছিলেন সিরাজের নানা নবাব আলীবর্দী খান। ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পরপরই আলীবর্দী খান বিহারের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। এ কারণে পরিবারে সিরাজ ‘সৌভাগ্য সূচক সন্তান’ হিসেবে বিবেচিত হন। সিরাজের প্রতি তাঁর পিতামহের ছিল বিশেষ স্নেহ ও পক্ষপাত। নওয়াবের অন্ধ স্নেহ এবং স্তাবকদের অতি প্রশংসার কারণে প্রথম জীবনে সিরাজ খুব সম্ভবত কিছু বাড়াবাড়ি করেন, এবং আলীবর্দী তা উপেক্ষা করেন। তিনি সিরাজকে খুব ভালোবাসতেন এবং সকল সামরিক অভিযানে তিনি সিরাজকে সাথে নিতেন।
১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে আলীবর্দী খান সিরাজউদ্দৌলাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। নবাব পদে সিরাজের মনোনয়ন প্রাপ্তিতে ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, মীরজাফর আলী খান এবং শওকত জঙ্গ তাঁর প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন। সিরাজের ক্ষমতারোহণ মুর্শিদাবাদের শাসক শ্রেণির প্রভাবশালী অংশের জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ। প্রথম দিককার নবাবদের সময়ে এই গোষ্ঠী ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করার কাজেই নিয়োজিত ছিল। সিরাজ শাসন ক্ষমতায় আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে এ গোষ্ঠী আশঙ্কা করে যে, সম্পদ কুক্ষিগত করনে তাদের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তরুণ নবাব বিপদজনক হতে পারেন। সিরাজের সিংহাসন লাভ ইংরেজদের পক্ষেও ছিল হুমকিস্বরূপ। কেননা পূর্ববর্তী নবাবদের মতো সিরাজ ইংরেজ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও বণিক গোষ্ঠী কর্তৃক দস্তক-এর অপব্যবহার মেনে নিতে অস্বীকার করেন।
কোম্পানির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগগুলির মধ্যে ছিল প্রথমত, নবাবের অনুমতি ব্যতীত ফোর্ট উইলিয়াম নামক দুর্গ নির্মাণ। দ্বিতীয়ত, ইংরেজরা মুগল শাসকদের প্রদত্ত বাণিজ্যিক সুবিধার অপব্যবহার করতে থাকে। ফলে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তৃতীয়ত, ইংরেজরা সরকারি তহবিল তছরূপকারী কৃষ্ণদাসকে (রাজবলভের পুত্র) আশ্রয় প্রদান করে। ইংরেজরা যদি প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় এবং মুর্শিদকুলী খান প্রদত্ত বিধি ও শর্তানুসারে বাণিজ্য করতে সম্মত হয়, তাহলে নবাব তাদের ক্ষমা করবেন বলে ঘোষণা দেন। উপরন্তু ইংরেজরা নাবাবের শর্ত তো মানেইনি বরং কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর ড্রেক ফোর্ট উইলিয়ামে প্রেরিত নবাবের বিশেষ দূত নারায়ণসিংহকে অপমান করেন।
এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ নবাব ইংরেজদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে কাসিমবাজার কুঠি অবরোধ করেন এবং পরবর্তীকালে কলকাতা অধিকার করে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। কলকাতার পতনের পর বাংলায় ইংরেজদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল প্রকৃতপক্ষে দুটি উপায়ে - হয় নবাবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে অথবা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। ইংরেজরা দ্বিতীয় পন্থাটিই গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত নবাবের বিরুদ্ধে কোম্পানি সাফল্যের সঙ্গে একটি ষড়যন্ত্র সম্পন্ন করে এবং মীরজাফর, জগৎশেঠ ও অন্যান্য ক্ষুব্ধ অমাত্যের সমর্থন লাভ করে। সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পর ক্লাইভ ও ওয়াটসন-এর অধীনে কোম্পানির শক্তি মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ যাত্রা করে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন নবাব পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের মুখোমুখি হন। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত হন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান।
পাটনা যাওয়ার পথে মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুলাই সিরাজ নিহত হন। সিরাজউদ্দৌলা ইতিহাসের ‘নায়ক’ (!)- আগেই উল্লেখ করেছি সিরাজের অপকর্ম তাঁর মাতামহ এড়িয়ে যেতেন। এজন্য তাঁর লাগামহীন জীবন যাপনের জন্য ক্ষমতায় আহরণের পূর্বেই তিনি অনেকের চক্ষুশূলে পরিণত হন। এমনকি সিরাজ তাঁর মাতামহের মৃত্যুশয্যায় পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি মদ্যপান থেকে বিরত থাকবেন। এ কথা সত্য যে, নবাব হিসেবে সিরাজ ছিলেন খানিকটা উদ্ধত এবং খুব সম্ভবত কিছুটা অসহিষ্ণু। অস্থির চিত্তের সিরাজের মধ্যে দৃঢ়তার অভাব ছিল। এছাড়া সংকটকালে সিদ্ধান্তহীনতা-ও তাঁর অন্যতম ত্রুটি। তবে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, সিরাজ তখন ছিলেন মাত্র চবিবশ বছরের এক অপরিণত যুবক। ক্ষমতা ও উচ্চাসন তাঁকে কিছুটা বেপরোয়া-ও করে তুলেছিল।
সিরাজউদ্দৌলার সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল এই যে, অনভিজ্ঞতার কারণে তিনি তাঁর সকল প্রতিদ্বন্দ্বী-কে একই সাথে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা যাতে সংঘবদ্ধ হতে না পারে সেরূপ কোন পদক্ষেপ তিনি নেননি। এরূপ সাবধানতা অবলম্বনে তাঁর ব্যর্থতা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করার মতো মানসিক দৃঢ়তার অভাবের কারণে-ই তাঁর পতন হয়। এ থেকে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, সেই সময়ের মত একটি টালমাটাল পরিস্থিতি-তে সিরাজউদ্দৌলা একেবারেই বাংলার সিংহাসনে বসার উপযুক্ত ছিলেন না। সুতরাং তাঁর নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত অদক্ষতা বাংলার পতন সময়ের আনুষ্ঠানিকতা-য় পরিণত হয়েছিলো। আমার মনে হয় ব্যক্তি সিরাজকে ইতিহাসের পাতায় মহিমান্বিত করে দেখার বিষয়টি নতুন ভাবে ভেবে দেখা দরকার।
মীরজাফর ও ‘বিশ্বাসঘাতকতা’- প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুধু বাংলার ইতিহাসে না, বিশ্ব ইতিহাসের একটি খুবই সাধারণ এবং নিত্য অনুষঙ্গ। বাংলায় খিলজির আগমনের পর থেকে স্বাধীন সুলতানি আমল পর্যন্ত অনেকগুলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটেছিলো। একের পর এক সুলতানকে হত্যা করে আমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল হতে দেখেছি। মধ্যযুগের ইতিহাসবিদ তোমি পিরেস তাঁর ‘সুমা ওরিয়েন্টাল’ বই-তে বাংলাকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘একটি রাজ্য যেখানে শাসককে হত্যা করে, নতুন শাসক ক্ষমতা দখল করেন’। এটি প্রমাণ করে যে তৎকালীন বর্হিবিশ্বে-ও বাংলা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিলো। শুধু বাংলা কেন? মুঘল সাম্রাজ্যেও (বাংলার মাদার ক্রাউন) আমরা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অনেকগুলো ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।
কারণ মুঘল সাম্রাজ্যের কোন উত্তরাধিকার নীতি ( Law of Primogeniture- বড় সন্তান নীতি) ছিলো না, বাদশাহের সন্তানদের মধ্যে যে অন্যদেরকে পরাস্ত করতে পারতো সেই হতো নতুন বাদশাহ। যেমন আওরঙ্গজেব তাঁর ভাইদের হত্যা করে এবং পিতাকে বন্দি করে ক্ষমতা দখল করেছিলো। মীরজাফর একজন ক্ষমতালিপ্সু হিসেবে যেটা করেছিলো সেটা ইতিহাসের পরিক্রমায় ব্যতিক্রম কিছু ছিলো না। পরবর্তীতে সে যদি তাঁর স্থানকে সুসংহত করে বাংলার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারতো তাহলে আজকের ইতিহাসে তাঁর অবস্থানটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো। সুতরাং ঢালাও ভাবে খুব নেতিবাচক ভাবে যদি আমরা মীরজাফর-কে চিহ্নিত করি, তাহলে ইতিহাসের আরো অনেক ঘটনাগুলোর পুনঃ সংগায়ন দরকার হবে।
সিরাজের পরাজয় কি বাংলা ও বাঙালির পরাজয়?: মির্জা মুহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন আলীবর্দী খানের দৌহিত্র এবং জৈনুদ্দীন আহমদ খান ও আমিনা বেগমের পুত্র। এই জৈনুদ্দীন আহমদ খান ছিলেন আলীবর্দী খানের বড় ভাইয়ের ছেলে। আলীবর্দী খানের মা ছিলেন তুর্কি ‘আফসার’ বংশোদ্ভূত এবং পিতা আফগান বংশোদ্ভূত। সুতরাং সিরাজউদ্দৌলা তো আসলে বাংলার কেউ না এবং উনি বাঙালি-ও ছিলেন না। তাঁরাও তো আগন্তুক যেমন ইংরেজরাও ছিলো আগন্তুক। বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক ছিলেন শশাঙ্ক। এরপরে পাল বংশের রাজারা ছিলেন বাংলার স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী, ক্ষেত্রবিশেষে আমরা দেব, চন্দ্র বা খড়গদের স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। তারপর দক্ষিণ ভারত থেকে সেনরা এসে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করে, এই সেনরা-ও কিন্তু বাংলায় আগন্তুক। তাহলে সিরাজউদ্দৌলার পতন কে ‘বাংলা’ কিংবা ‘বাঙালি’র স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত যাওয়া বলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে?
মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ মিলন: শিক্ষক, ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।