শিরোনামের কথাটা শোনা হয়নি এমন মানুষ হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই শিশু বয়সে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষক, বন্ধু বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী এমনকি সন্তানের থেকেও এই কথা জীবদ্দশায় শোনা যায়৷ কথাটা হয়ত সামান্য কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এই কথার প্রভাব কিন্তু সামান্য নয়। শিশু বয়সে এই সামান্য কথাটাও হতে পারে হিংসাত্মক মনোভাবের বীজ বপন করে দেওয়ার কারণ। সেই সাথে হতে পারে- শিশুকে সারা জীবনের জন্য অসুখী করে দেওয়া। কিভাবে? চলুন মিলিয়ে দেখি। ছোট বেলায় ধরুণ হারাধনের সাথে আপনার তুলনা করে বলা হয়েছে যে, ‘হারাধন তো ক্লাসে ফার্স্ট তুমি কেন হতে পারো না? তুমি কি কম খাও না তোমার চার হাত পা নেই?’ স্বাভাবিক ভাবেই ওটুকুন বয়সে আপনার আত্মসম্মানে লাগবে।
আসলেই ভাবা শুরু করবেন হারাধনের কি আছে যা আপনার নেই? দেখবেন ক্লাসের ফার্স্ট হওয়াতে হারাধন সকলের সমাদর পাচ্ছে শ্রেণি শিক্ষকদের অতিরিক্ত আদর পাচ্ছে, যা আপনি পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় হীনমন্যতায় ভোগা কি স্বাভাবিক না? হয়ত ক্লাসের সকল বিষয়ে সমান ভালো করা আপনার পক্ষে আসলেই সম্ভব না, তাও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এতে হয়ত আপনার ছবি আকাঁর বা গানের দক্ষতাটা চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হল হারাধনের কোন বিষয়ে খারাপ নম্বর এসেছে। কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে অথচ আপনার নিজের অজান্তেই খুশি লাগছে। যে আপনাকে হারাধনের সাথে তুলনা করে শুনিয়েছিলো তাকে সগৌরবে হারাধনের ব্যর্থতার কথা জানালেন!
ঘটনাটা কম বেশি আমাদের সবার পরিচিত অথচ আমরা কি খেয়াল করেছি এই প্রক্রিয়ায় একটা বড় জিনিস আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষের পশুবৃত্তিকে দমন করে সুকুমার ও সৃজনশীলতা চর্চা যে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য সেই শিক্ষায় উল্টো পশুবৃত্তিকে লালন করা হচ্ছে। এই হিংসাত্মক মনোভাবের প্রতিফলন আমরা কিন্তু জীবনের নানা স্তরে দেখে আসছি৷ আবার হারাধনের সাথে অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় ফেলে আপনাকে কিন্তু সার্বক্ষণিক একটা অস্বস্তিতে ফেলা হয়েছে। এর প্রভাব ও কিন্তু কম নয়। ‘অমুকের তো তমুক আছে, আমার কেন নেই’ এই কথাটা কিন্তু মানসিক অশান্তির-ই ফল। এ কারণে প্রাপ্তি বা অর্জন যতই আসুক জীবনে হয়ত আপনার সুখী হওয়া হয়ে ওঠেনা। কারণ তার থেকেও সফল কেউ না কেউ থাকবে। এই অর্জনের বৈতরণি পার হতে হতে হয়ত এক দিন জীবনটাও শেষ হয়ে যায়।
অভিভাবকগণও কিন্তু এসব বিষয়ে কম যান না। শিক্ষিত বাবা মা জানেন ঠিকই যে, এই ধরণের তুলনা শিশুদের জন্য কত ক্ষতিকর। তবুও এ ধরণের খোটামূলক কথা এখনো শিশুরা শুনে আসছে। বলা যায় কথাটা কালজয়ী বাক্য। অথচ আমাদের শিক্ষক অভিভাবকদের জোর দেওয়া উচিত ছিল শিশুদের ‘মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স’ এর উপর৷ শিক্ষার্থীদের ৮ ধরণের ইন্টেলিজেন্স এর উপর প্রতিষ্ঠিত ডঃ হার্ভার্ড গার্ডনারের যে তত্ত্ব রয়েছে সেটিকে প্রাধান্য দিলে জানা সম্ভব হত কোন শিক্ষার্থীর প্রতিভা কোন ক্ষেত্রে এবং সেটিকে কিভাবে বিকশিত করা যায়।
শিক্ষার্থীরা তখন হয়ত নিজেকে অন্যের প্রতিযোগী না ভেবে নিজেকে নিজের প্রতিযোগী হিসেবে ভাবতে পারত এবং আত্মউন্নয়নে কাজ করতে পারত। সেই সাথে অন্যকে সহযোগী হিসেবে ভাবতে পারত। পারত পক্ষে উন্নত বিশ্বে আমরা কিন্তু এ ধরণের চর্চা-ই দেখতে পাই। আমাদের সমাজকে মানবিক উন্নয়নের জন্য হলেও অহেতুক তুলনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (One of a kind)। আশা করি সেই দিন বেশি দূরে না যখন মানুষ স্বকীয়তাকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[প্রিয় পাঠক, মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে বাংলা রানার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। মুক্তমত কিংবা বাংলা রানারে প্রকাশিত কোন মতামতের প্রতিক্রিয়া পাঠাতে পারেন brtube717@gmail.com এই ঠিকানায়]