সেই দিনের অভিজ্ঞতাটা ছিল পুরাই অন্যরকম। গত ফেব্রুয়ারিতে গণভবনের গেট পার হতে না হতেই বুকের মধ্যে কেমন যেন কাঁপুনি দিয়ে উঠল। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আপার পরামর্শ ও নির্দেশ জানতে আমরা গিয়েছিলাম। প্রথমবার যাওয়ায় ভালই ভয় ভয় লাগতেছিল। আপার সামনে যাচ্ছি! যিনি শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই না, অনেকের জন্য রোল মডেলও। তবুও সাহস সঞ্চার করে অধিক আগ্রহে এগিয়ে চলা। হাটতে হাটতে এগিয়ে গেলাম আপার রুমের সামনে। ইতিমধ্যে অনেকটা ভয় কেটে গেল। স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। গণভবনের ভিতরে গিয়ে যে রুম দিয়ে আপা প্রবেশ করবেন সে রুমে বসলাম প্রথমে।
পাশের ছোট্ট রুমটিতেই বসলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক ভাই, আব্দুর রহমান ভাই, বাহাউদ্দিন নাছিম ভাই এবং বি এম মোজাম্মেল ভাইয়েরা। তারা আমাদেরকে ডেকে তাদের রুমে যেতে বললেন। তাদের রুমে গেলাম এবং বসলাম। চা- বিস্কুট খেলাম। চা বিস্কুট খাওয়ার মাঝে কিছু হাসি ঠাট্টাও হয়। এর মধ্যেই নাছিম ভাই আমাদের অনেকটা ওয়াদা করালেন যেন আপার সামনে আমরা বেশি কথা না বলি।
চা শেষ করতে না করতেই আপা কাছাকাছি চলে আসছেন বলে আমাদের ডাকা হল। আমরা চার জন (ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি সোহান খান, বর্তমান সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-সম্পাদক আল মামুন ও আমি) দরজার সামনে গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। এসএসএফের খুব কড়া নির্দেশ যেন কোন রকম নড়াচড়া না করি। আবেগে যেন কোন কিছু না করে ফেলি। এমনকি পায়ে সালাম পর্যন্ত করতে বারণ করলেন।
আপা আসলেন। আপাকে দেখা মাত্র আমি অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলাম। আমরা টিভির পর্দায়, বিভিন্ন প্রোগ্রামে আপাকে যতটা রিল্যাক’স মুডে দেখি সেদিন দেখেছিলাম একটু অন্যভাবে। বিষণ্ণ, ক্লান্তিকর মুখ, চুলগুলো অধিকাংশই পাক ধরেছে, কপালের পাশে কয়েকটা ব্রণের মত। অন্যান্য দিনগুলোর তুলনায় সেদিন একটু বেশিই বৃদ্ধা মনে হয়েছিল আমাদের এই আলোর দিশারীকে। আর বিষণ্ণ না দেখিয়েই উপায় কি। সেই সকাল ৮ টায় বের হয়েছেন আর ফিরলেন রাত ১০ টায়। প্রায় টানা ১৪ ঘণ্টা কাজ করে ফিরেছেন।
বাস্তবে না দেখলে লিখে ওই মুহূর্তটা বুঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। এত কিছুর পরেও তার ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি ভালবাসা আমাকে চরমভাবে আকর্ষণ করে। আপা মন দিয়ে আমাদের কথা শুনলেন, সংগঠনের বিষয়ে জানলেন। উপদেশ দিলেন, প্রেরণা দিলেন। প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শোনার পরে বিদায় নিলেন।
এবার আসা যাক মোদ্দা কথায়। যেই মানুষটি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবে আমাদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তাকে দেখে কি আমরা একটু শিক্ষা নিতে পারি না। নেতৃবৃন্দ, আমলা, কর্মকর্তাবৃন্দ যারা একবার হলেও আপার সান্নিধ্য পেয়েছেন তাদের মধ্যে মানুষের প্রতি ভালবাসা তৈরি হওয়ার কথা। একজন মানুষের তার জনগণের প্রতি কতটা ভালবাসা থাকলে এভাবে দিন-রাত্রি কাজ করতে পারেন! তার কিসের এমন অভাব যে এভাবে দিন-রাত্রি কাজ করতে হবে। এ ভালবাসা দায়বদ্ধতার। এ ভালবাসা পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার।
স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে পিতার নেতৃত্বে। স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব পড়েছে মেয়ের কাধে। এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটানো, সোনার বাংলা গড়ে তোলা, পিতার রেখে যাওয়া অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করাই তার একমাত্র লক্ষ্য। এত কিছুর পরেও একদল হায়েনা গ্রুপ বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে বারবার বিশ্বাসঘাতক বলে জানান দিতে চায়। যেমনটি করেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যদিয়ে।। সেদিন উইলিবান্ট বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না; যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।
স্বাধীনতা বিরোধী এই অপশক্তি নস্যাত করতে চায় এদেশের স্বাধীনতা, তারা হত্যা করতে চায় ১৬ কোটি বাঙালির স্বপ্নের কারিগর দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে। হায়েনারা জানে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারলে এদেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না। তারা ১৫ই আগস্টের মধ্যদিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল বাঙ্গালী জাতির গতিপথ। তারা এ রকম ১৫ই আগস্ট ঘটানোর জন্য এখনো তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
জন্ম দেওয়া হয়েছে ২১ আগস্ট, ১৭ আগস্টের মত ঘটনা। কেন যেন হায়েনারা আগস্টকেই বেছে নেয়। এ পর্যন্ত আমাদের প্রাণের নেত্রীর ওপর প্রায় ২৪ টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ আগস্টের হামলাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন বেঁচে ফিরেছেন আমাদের প্রাণের নেত্রী। এই আগস্টে প্রার্থনা- ‘নতুন করে আর কোন শোক বাঙালির জীবনে না আসুক’।
লেখক: ছাত্রলীগ নেতা