আমাকে জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, আমার বাবা জেলেই আছেন!

রনি মুহাম্মদ
শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১


“যখন আয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন আমরাও শরিক হলাম। স্কুল থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মিটিং শুনতে যেতাম এবং আমাদের স্কুলে যাতে ধর্মঘট হয় সেই ব্যবস্থাও করতাম। একবার সকলে মিলে ঠিক করলাম ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে স্কুল বন্ধ করে দেব। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীরা সবাই মিলে পরামর্শ করলাম একদল গেটে থাকবে, আরেক দল ঘণ্টা বাজাবে। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে গেট খুলে দেবে। যেই কথা সেই কাজ আমরা কয়েকজন ঘণ্টা বাজালাম। অন্যদল গেট খুলে দিল। পাশেই ছোটদের প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। ছুটির ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস ছেড়ে বই খাতা নিয়ে দে ছুট। গেট দিয়ে বের হতে শুরু করলাম। অধিকাংশ মেয়েই বের হয়ে গেছে। প্রথমে শিক্ষকরাও বুঝতে পারেননি বিষয়টি কি? পরে যখন বুঝতে পারলেন তখন আর সময় নেই। আমরা রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আপারা এসেছিলেন। পলাশীর মোড় হয়ে আমরা বটতলায় মিটিংয়ে শরিক হলাম।”

কথাগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। শত বাধায়ও থেমে ছিল না তার চলার পথ, থেমে ছিল না ধর্মঘট। আপোষহীন নেতৃত্বে তিনি লড়েই যাবেন তার আদর্শে। বিভিন্ন কৌশলে চলছিল তাদের আন্দোলন। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন-  “ঐদিন আমরা ঠিক করলাম স্কুল শুরু হওয়ার আগেই গেটে পিকেটিং করবো। কয়েকটা মেয়েসহ হাত ধরে গেটের সামনে দাড়াঁলাম। এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি এল। একজন অফিসার এসে ধমকাতে শুরু করল। আমরা তখনো গেটে দাড়াঁনো। আমার নাম জিজ্ঞেস করল। এর একটু আগেই হেড মাস্টার সাহের আমাদের নাম লিখে নেওয়ার জন্য একজন শিক্ষককে পাঠিয়েছিলেন। তিনি লিখে নিয়ে গেছেন। সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে বললাম, হেড স্যার লিখে নিয়ে গেছেন আপনি ওনার কাছ থেকে জেনে নিন। তিনি আমাকে গ্রেপ্তার করার হুমকি দিলেন। আমি তাকে বললাম, প্রায় প্রতি সপ্তাহে অথবা কখনো মাসে দু’বার জেল গেটে যাই। কাজেই আমাকে জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমার আব্বা জেলেই আছেন।”

ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে বেড়ে ওঠা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো লিখেছেন-  “বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিউটি আপারা এসেছিলেন। তারা একটু দূরে গাছ তলায় দাড়িঁয়ে আমাকে ইশারা করলেন গেট ছেড়ে চলে যেতে। কয়েকটা মেয়ে নিয়ে তার সঙ্গে মিছিল করে রওনা হলাম বটতলার উদ্দেশ্যে। পুলিশের গাড়ি আমাদের ধাওয়া করল। শুধু ভয় হচ্ছিল হেড স্যার বকা দেবেন। তবে আমরা তো কোন অন্যায় করিনি। আমরা একটা আদর্শের জন্য লড়ছি। আমাদের ভাষা বদল করে ভিন্ন ভাষার শব্দ দিয়ে বাংলা ভাষা লেখা হবে। রোমান হরফে বাংলা লেখার চিন্তা ভাবনা। এটা কি করে আমরা সহ্য করব।”

তিনি নীতি আদর্শে যেমন অনড় ছিলেন তেমনি তাকে গ্রাস করতে পারেনি কোন লোভও। তিনি বলেছেন, “আমার স্বামী আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরি করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যদিয়ে চলতে হতো। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে হিসেবে কয়েকটি বাড়ি, শিল্প, কলকারখানাসহ অনেক কিছুরই মালিক হতে পারতাম যদি ইচ্ছে করতাম। সে ইচ্ছা কখনো করিনি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন জাতি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছি তাতেই মনটা ভরে ছিল। বরং আমাদের থেকেও কষ্টে কারা আছে তাদের কিভাবে সাহায্য করব সেই চিন্তাই ছিল। কখনো নিজে সম্পদের মালিক হবো এই লোভ লালসা আমাদের গ্রাস করে নাই। একটা নীতি আদর্শ নিয়ে আমরা বড় হয়েছি। বাবা মা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়েছেন। আমার আব্বা বলতেন সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে চলবে। তোমার থেকে কে বেশি কষ্টে আছে তাই দেখবে তা হলেই বুঝবে তুমি কেমন আছ?”

তিনি যেমন ছিলেন আন্দোলন সংগ্রামে তেমন ছিলেন বান্ধবীদের খুনশুটিতেও। বান্ধবীদের সাথে শাড়ি পড়ে ঘুরে বেড়ানো, আখ ক্ষেতে গিয়ে আখ ভেঙ্গে খাওয়া, কাদামাখা কাপড় পড়ে খেলা। কোন কিছুতেই যেন তার অপারগতা নেই। তার এই বহুমাত্রিক গুণের কারণেই আজ তিনি বিশ্ব নেতায় পরিণঙঙত হয়েছেন। আজ তার অর্জন এবং খ্যাতির শেষ নাই। তিনি একজন মা হিসেবেও আদর্শ শিক্ষক। তিনি তার ছেলে মেয়ে, বোন শেখ রেহানা, বোনের ছেলে মেয়েরা সকলকেই এই নীতি ও আদর্শ শিক্ষা দিয়েছেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর বোন হয়েও শেখ রেহানা লন্ডনে বাসে চড়ে অফিস করতেন। জয়, পুতুল, ববি, টিউলিপ চার ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, মানুষ করেছেন। তারা চাকরি বাকরি করে খাচ্ছেন। তাদের লোভ লালসায় পেয়ে বসে নাই। তাকে তার সন্তানদের নিয়ে কোন বদনাম শুনতে হয় না। মানুষের মত মানুষ হয়েছে।

আজ এই বঙ্গকন্যার ৭৩ তম জন্মদিন। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কোল ভাসিয়ে ১৯৪৭ সালের আজকের দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় টুঙ্গিপাড়ায় এক পাঠশালায়। শেখ হাসিনা ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে পড়ার সময়  ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি(ভিপি) নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ছয় দফা আন্দোলনেও সক্রিয় অংশ নেন। জন্ম তিথিতে প্রিয় আপার জন্য রইল অনেক অনেক দোয়া ও শুভ কামনা।

লেখক: ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা