দায়টা আসলে কার ব্যক্তি নাকি সংগঠনের?

ফয়সাল আহমেদ
সোমবার, ০৭ অক্টোবর, ২০১৯


মনে করেন আমার বা আপনার বোন/বান্ধবী/নিকটাত্মীয় কেউ ধর্ষিত হলো সুযোগমতো আপনিও দায়ীদের বোন/বান্ধবী/নিকটাত্মীয় কাউকে ধর্ষণ করলেন। আপনার কি মনে হয় কাজটা করা সমুচিত? আমার বিচার আমিই করলাম! তারা করেছে আমি করলে দোষ কি? তখন তোমার সময় ছিলো এখন আমার সময়!

যদি আপনি এটা সঠিক বলে মনে করেন তাহলে আপনার সাথে কথা শেষ এখানেই। পরের কথাগুলো অন্যদের জন্য! অভিজিৎ, বিশ্বজিৎ, ত্বকী, অনন্ত, রাউফুন বসুনিয়া, বাদল সবাই হত্যার স্বীকার। হত্যা না ঠিক, বলা যায় রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণ করায় প্রতিহিংসার বলি। এখন আসেন কেন এমন হয়? দায় ঠিক কার? এটা কি ব্যক্তির দায় নাকি সংগঠনের দায়?

আমার মতে দায় সংগঠনের। প্রথমত, ব্যক্তির দায় নয়, কারণ এটা ব্যক্তিগত আক্রোশ, স্বার্থ কিংবা লাভের জন্য করা হয় নি। যদি এমন হয় তবে তা ব্যক্তির দোষ, সংগঠনের দায় নেই। 

দ্বিতীয়ত, দায়টা সংগঠনের কারণ সংগঠন আপনাকে শিক্ষা দেয়া শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি, ঐক্য এমনসব শ্লোগান ধারণ করতে। এইসকল শ্লোগান দিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করেন দেশ, সমাজ এবং মানবতার জয়গানের জন্য। আবার এই সংগঠনই আপনাকে দিয়ে শ্লোগান দেয়ায়-

"লীগের চামড়া, তুলে নিব আমরা।
একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।
পাকিস্তানি খালেদা, পাকিস্তান চলে যা।
চশমাওয়ালা বুবুজান, বাংলা ছাইড়া ভারত যান।
নাস্তিকদের আস্তানা, ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও।
বদর যুদ্ধের তলোয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার।"

সংগঠন আপনাকে এই আদর্শ শিক্ষা দেয় যে রাজপথের গলা ফাটানো শ্লোগান আপনার আদর্শ হবে। এমন উগ্র স্লোগান কেন দলগুলোর কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়? সবগুলো দলই- আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপি, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, জামাত, শিবির সবাই উগ্রবাদী শ্লোগান তোলে। 

এখন কথা হলো যে সংগঠন আপনাকে উগ্র শ্লোগান তুলতে শেখায়, ভিন্নমতাদর্শীদের বঞ্চিত করার, নির্যাতন, দমন, পীড়ন ইত্যাদি করতর শেখায় সেই সংগঠনের কি দায় নেই?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠন স্লোগান তুলেছিল 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।
বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।'
সংগঠন হিসাবে আপনি ভালো কাজের অংশীদারিত্ব নিলে খারাপ কাজের দায়ও নিতে হবে বৈকি!

আপনার সাথে অন্যায় হলে বিচার পাওয়া যেমন আইনগত এবং সাংবিধানিক অধিকার তেমনি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন করাও সাংবিধানিক অধিকার যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐ সংগঠন দেশের সংবিধান দ্বারা নিষিদ্ধ না হয়। যদি কেউ এমন সংগঠন করে তবে আইন আপনার হাতে তুলে নেয়ার অধিকার রাষ্ট্র আপনাকে দেয় নাই। বিচার করবে রাষ্ট্র। কিন্তু এখানেই আমাদের দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ এক। ভিন্নমতের কাউকে সুযোগ পেলে ছাড় দেয়া হয় না। সেটা সে ডান, বাম, নাস্তিক যে আদর্শ হোক না কেন!

সময় এসেছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংস্কারের। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য সবচাইতে দুঃখের বিষয় হলো রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার অভাব। এরিস্টটল এর ভাষায় মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক জীব। দমন-পীড়ন করে কেউই কখনোই ভালো থাকেনি। মুসলিম লীগ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে। 

দেশের নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখা উচিত দেশের মোট জনশক্তির প্রায় ৩০% তরুণ। অতিসম্প্রতি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কিশোর-কিশোরীরা যদি আসছে ফাল্গুনে দ্বিগুণ হয় তখন সামাল দিতে পারবেন তো?

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।