প্রসঙ্গ: ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ

দু-একটি সন্তান বিপথগামী হলে সন্তান জন্মদানই বন্ধ করে দিবেন?

তালুকদার সুকান্ত লেনিন
মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ ঘটে যাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড সারাদেশের সকল মতের মানুষের মতো আমাকেও কাঁদিয়েছে। ঘটনার জেরে আবরার ফাহাদের সহপাঠীরা বেশ কিছু দাবি তুলেছে। যার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি হল- বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যাপারটি বুয়েট প্রসাসনের উপরই ন্যাস্ত করেছেন। আর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বুয়েটের সম্মানিত উপাচার্য সেখানে সকল প্রকার সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন। হয়তোবা এই নির্দেশ উপেক্ষা করে সেখানে কেউ সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি করবে না। কিন্ত বিভিন্ন মহল থেকে সারাদেশে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধের যে দাবি তোলা হচ্ছে আমার বিতর্ক ও প্রশ্ন সেখানেই। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দাবি কেবল অযৌক্তিকই নয় বরং আত্মঘাতী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা কেন্দ্রিক আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ- এই সংগ্রামগুলো সম্পর্কে যারা অজ্ঞাত তারা যদি আজকে এই দাবি তুলত তবে আমার বিতর্কের প্রয়াস হতো দেয়ালের সাথে কথা বলার ন্যায়।

কিন্ত সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে যারা এই দাবিতে সোচ্চার তারা অবশ্যই মেধাবী এবং সচেতন বলে আমার বিশ্বাস। কারণ তারা দেশসেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমি মনে করি এই মেধাবীমুখগুলো এই দাবিটি তুলে বাংলার ভবিষৎ রাজনীতিকে করতে চাইছেন সংকুচিত। স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের ইতিহাসকে কি আপনারা উপড়ে ফেলতে পারবেন? উত্তর যদি "না" আসে তবে কিভাবে আপনারা সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী তোলেন? 

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা ডাকসুর ভিপি নুরুল হল নূর একাত্তর টিভির একটি টকশোতে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও শিবিরের রাজনীতি বন্ধের দাবী করেছেন। কিন্ত তার সংগঠন 'সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষন পরিষদ' নিষিদ্ধ হোক সেটি তিনি চান না। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, তার সংগঠন কোন দলের লেজুড়বৃত্তি করে না। তাই তাদের সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধের দাবি অযৌক্তিক। জানি না সম্মানিত ভিপি লেজুড়বৃত্তি বলতে কি বুঝিয়েছেন। তবে সাধারণ ভাবনা থেকে বলতে পারি, তিনি মূল দলের ভ্রাতৃপ্রতিম বা সহযোগী সংগঠনের কথা বলেছেন। 

আমরা যদি একটি রাজনৈতিক দলকে একটি পরিবার ভাবি তবে ছাত্রসংগঠন হবে তার সন্তানতুল্য। অভিবাবকের দিকনির্দেশনা ছাড়া যেমনি একজন সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায় না, ঠিক তেমনি মূল সংগঠন না থাকলে সন্তানতুল্য ঐ সংগঠনগুলো সঠিকভাবে চলতে পারে না। তবে শত চেষ্টার পরেও কোন কোন পরিবারের দু-একটি সন্তান বিপথগামী হয় তা অস্বীকারযোগ্য নয়। তাই বলে কি মানুষ সন্তান জন্মদান বা পালন করা বন্ধ করে দিবে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ঘাম ঝড়ানো আমার ভাই-বোনেরা পূর্ণাঙ্গ দাবির বাস্তবায়নের চিত্র প্রত্যক্ষ না করেই কেন রাজপথ ছাড়লো? জানি উত্তর আসবে সরকারের অপতৎপরতা। শাসন বিভাগ জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা নিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সরকার তাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্ত তাদের রাজপথ ছাড়ার কারণ হিসেবে আমি বলবো সাংগঠনিক নেতৃত্ব না থাকা। ইতিহাসের কোন আন্দোলনই বিচ্ছিন্নভাবে সফল হয়নি বরং সফল হয়েছে সাংগঠনিক নেতৃত্বসম্পন্ন আন্দোলনের ফলে।

একজন ছাত্রের নেতৃত্বের বিকাশে ছাত্র সংগঠন মূল্যবান উপাদান। ছাত্র রাজনীতি ছাড়া কখনো জাতীয় রাজনীতি পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। অন্তত এই আমার দেশের প্রেক্ষাপটে। তবে দাবি তোলা যায়, শিক্ষাঙ্গন ব্যতীত ছাত্র সংগঠনগুলোর অন্যান্য ইউনিট যেমন: ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করার। তবে মহানগর কেন্দ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রয়োজন আছে। কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত মহানগর কেন্দ্রিক হয়। তাই তাদের রাজনৈতিক চর্চায় এই কার্যক্রম বলবৎ থাকা প্রয়োজন। না হয় তৈরি হতে পারে  নর্থ সাউথের ছাত্র ‌'নিব্রাস' এর মতো জঙ্গী।

সবশেষে বলছি ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ হলে- ১.জাতীয় রাজনীতিতে যোগ্য নেতৃত্বের সংকট, ২. বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাসন তথা সরকারি কলেজগুলোর প্রসাসনের স্বৈরাচারি মনোভাব, ৩. উগ্র জঙ্গীবাদের চর্চা এবং ৪. গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। তাই বলি- দাবী তুলুন সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয় বরং এর সংস্কার চাই।

লেখক: সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।