নিথর দেহখানি ঝুলে ছিল কদমের ডালে
'নিথর দেহখানি ঝুলিয়া ছিল কদমের ডালে, কপোল ভিজিয়া গেল নয়নেরও জলে'। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের গচিয়া কেজাউড়া গ্রামে শিশু তুহিনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনে দেশবাসীর ‘কপোল ভিজিয়া গেল নয়নের জলে’। মাত্র পাঁচ বছরের শিশু তুহিন। কী নিষ্পাপ একটি সন্তান। পাপ ঢাকতে পিতার হাতে সন্তান হত্যার নিমর্মতা যে কোন মানুষের গায়ে কাঁটা দিবে। যে গলা দিয়ে বাবার কাছে আইসক্রিম কিংবা পুতুলের বায়না ধরার সুর তোলার কথা ছিল শিশু তুহিনের সেই গলা রক্তাক্ত করে দিয়েছে বাবা নিজেই। গত ১৪ অক্টোবর তুহিনকে ঘুমন্ত অবস্থায় তার বাবা আব্দুল বাছির ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যান। তার কোলে রেখে তুহিনের গলা কেটে দেন চাচা নাছির উদ্দিন ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ার। প্রাণহীন ছোট্ট দেহটার বুকে দুটি ছুরি বিদ্ধ করে লাশ কদম গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেন তারা। ঝুলানোর আগে ছোট্ট মানুষটার সঙ্গে সভ্যতার নিকৃষ্ট, পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতা চালায় খুনিরা। তুহিনের দুটি কান ও লিঙ্গ কেটে দেয় তারা। পর দিন কদমগাছের ডালে তুহিনের নিথর দেহ দেখে শিউরে ওঠে গ্রামবাসী। জানা গেছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তুহিনের বাবা-চাচা নিষ্ঠুরতার পথ বেঁছে নেয়। তার মরদেহে বিদ্ধ ছোরা দুটির হাতলে লিখে দেয় দুজন প্রতিপক্ষ সোলেমান ও সালাতুলের নাম। শোকে শব্দহীন তুহিনের মা মনিরা বেগমের দায়ের করা মামলায় তাকের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পানি চেয়েছিল, জাবাব এসেছিল- ও নাটক করে!
মেডিকেলে কিছুদিন ক্লাসও করেছিলেন। মা চেয়েছিল ছেলে চিকিৎসক হোক। কিন্তু ছেলের মন রক্ত আর ওষুধের গন্ধ থেকে দূরে ছিল। সে জীবনের নৌকা ঘুরিয়ে চলতে শুরু করে প্রকৌশলী হবার পথে। তুখোড় মেধা থাকায় সে যাত্রায় বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি কেউ তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রত্বকে নাকচ করে দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলছিলাম বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ১৭ তম ব্যাচের ছাত্র আবরার ফাহাদের কথা। তড়িৎ গতিতেই প্রথম বর্ষ পেরিয়ে তিনি দ্বিতীয় বর্ষের সিঁড়ি পার হচ্ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার সোচ্চার ছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। লিখতেন নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য তিনি লিখেছেন। স্বভাবসুলভ আচরণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। ৫ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে দেয়া ওই পোস্টে আবরার ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া ও গ্যাস রপ্তানির সমালোচনা করেছিলেন। পোস্ট লেখার সময়ে তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে।
পরীক্ষা আসন্ন হওয়ায় পরেরদিন ৬ অক্টোবর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিকেলে তিনি বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে ফেরেন। রাত ৮টার দিকে দরজায় কড়া নাড়তেই আবরারকে হাজির হতে দোতলার ২০ ১১ নম্বর কক্ষে। সেখানে ফেইসবুক পোস্টের জন্য ছাত্রলীগ নেতাদের জেরার মুখে পড়েন। বিভিন্ন গণমাম্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জেরা ও ক্রিকেট স্টাম্পের আঘাত দুটোই সমানতালে চলতে থাকে তার উপর। নির্যাতনকারী ছাত্রলীগ নেতারা পেটানোর ফাঁকে ফাঁকে মদ পান করে। পেটানোর একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মারের চোটে বমি করে দিলেও দয়া হয়নি খুনিদের। পৃথিবীর আলো ত্যাগের আগে পানি পান করতে চেয়েছিল আবরার। জবাবে খুনিরা বলেছে, ‘ও নাটক করছে’। মারের মুখে মারা গেলে আবরারের নিথর দেহটি খুনিরা প্রথমে হলের দোতলা ও নিচতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে নিয়ে রাখেন। পরে সিঁড়ি থেকে লাশ রাখা হয় হলের ক্যানটিনে। ভোর হলে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে।
পাশবিক এই হত্যায় ক্ষোভে ফুসেছিল গোটা দেশ। নৃশংসতা দেখে ছাত্র রাজনীতির প্রতি ঘৃণা জন্মে গিয়েছে শিক্ষার্থীদের। বুয়েট অবরুদ্ধ করে ক্যাম্পাস থেকেই তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ছাত্র রাজনীতি। মামলা দায়েরের পরপরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে আসামীদের, বুয়েট থেকে বহিষ্কার করে বাতিল করা হয়েছে ছাত্রত্বও।
বেরিয়েছিলেন আলোর সন্ধানে, ফিরেছেন এক পৃথিবী অন্ধকার নিয়ে
তাসলিমা বেগম রেনু, এক ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সে সবার ছোট ছিল সে। পড়ালেখা শেষে তিনি ঢাকায় আড়ং ও ব্র্যাকে চাকরি করেছিলেন। প্রাইভেটও পড়াতেন তিনি। তসলিম হোসেন নামক এক যবকের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন রেনু। দাম্পত্য জীবনে দুটি সন্তানেরও মা হয়েছিলেন তিনি। দুই বছর আগে পারিবারিক কলহের কারণে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর ছেলে তাসফিক আল মাহি (১১) বাবার সঙ্গে এবং মেয়ে তাসলিমা তুবা (৪) থাকতো মায়ের কাছে।
মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার বিষয়ে খোঁজ নিতে গত ২০ জুলাই সকালে রাজধানীর উত্তর পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন রেনু। মেয়েকে ভর্তির জন্য ওই স্কুলে খোঁজ নেয়ার সময় কথাবার্তায় সন্দেহ হলে মুহুর্তের মধ্যে লোকজন জড়ো হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে বিদ্যালয় মাঠেই তাকে প্রকাশ্যে পাশবিকভাবে পেটাতে শুরু করে উন্মত্ত জনতা। শতবার বলেও রেনু বিশ্বাস করাতে পারেননি তিনি ছেলেধরা নন। তার বাঁচার আকুতি কেউ শোনেনি। নির্দয়ভাবে একজন মমতাময়ী মাকে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
রেনুকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাঁদিয়েছে কোটি মানুষকে। হৃদয় নামের এক যুবক রেনুকে সবচেয়ে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করেছে। যখন সে দেখছে রেনুর হাতের একটি আঙ্গুল নড়ছে, তখন ওই আঙ্গুলে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। যখন দেখেছে পা নড়ছে, তখন লাঠি দিয়ে পায়ে আঘাত করেছে। মৃত্যু নিশ্চিত করে তারপর সে ক্ষান্ত হয়।
সেদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছেলেধরার গুজবের কারণে আরও চার জন গণপিটুনিতে নিহত হন। রেনুর পরিকল্পনা করেছিলেন আমেরিকা চলে যাবেন বড় ভাই আলী আজগরের কাছে। কিন্তু তিনি কি জানতেন এতটা নির্মমভাবে তাকে চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। বৃদ্ধা মা ছবুরা খাতুনসহ স্বজনদের মাতম আর আহাজারিতে শুধু একটাই বার্তা ছিল- মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন? রেনুর ছোট্ট মেয়ে তাসলিমা তুবা জানে তার মা বাইরে আছে। মায়ের কথা মনে পড়তেই সে বলে ওঠে- ‘মাকে ফোন দাও, চিপস আনবে’। কিন্তু সে কি জানে- তার মা আর কখনোই তার ছোট্ট গালে চুমো খাবে না?