বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
পৃথিবীর ইতিহাসে হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। সভ্যতার যাত্রাকালে মানুষ তার স্বার্থের জন্যে কিংবা আধিপত্য বিস্তার করতে যেয়ে যুগে যুগে নিজেকে দানবের মূর্তিতে দাঁড় করিয়েছে। পশুত্বের লড়াইয়ে বহু রক্ত ঝড়িয়ে মানুষ সভ্য হয়ে সভ্যতা গড়েছে। নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে গড়েছে আইন, প্রথা ও নানা নিয়ম। তবুও সকল নিয়ম ও নিষেধ ভঙ্গ করে মানুষ কখনো কখনো সমাজ-সভ্যতার আয়নায় পশুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে আবির্ভূত হয়। শুধু প্রাণে নাশ করেই ক্ষান্ত হয় না, নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতার বর্ণনা শুনলে জীবত মানুষেরও রক্ত শীতল হয়ে যায়। কেন এতটা বিভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটে- বিশ্লেষকদের মতামত জেনেছেন- এম.এস.আই খান
রাজনৈতিক প্রশ্রয় আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব যুগান্তরকে বলেন, নৃশংস ঘটনাগুলোর প্রত্যেকটার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আবরারকে যেভাবে মারা হয়েছে সেটার এক ধরণের প্রেক্ষাপট, তুহিন বা রাজনকে যেভাবে মারা হয়েছে সেটার প্রেক্ষাপট আরেক ধরণের। তবে সামগ্রিকভাবে আমরা এ জিনিসগুলোর দুটো ধরণ দেখতে পাই। একটা হল মানুষের ভীষণভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে যাওযা, যেটার সঙ্গে রাজনীতির বিষয়টি সম্পৃক্ত। আরকেটি হচ্ছে মানুষ ভীষণভাবে আক্রমণাত্মক হচ্ছে যেখানে অরাজনৈতিক লোকজনও জড়িয়ে পড়ছে, যেটা তুহিন বা রাজনের ক্ষেত্রে হয়েছে। আক্রমণাত্মক হওয়ার পিছে যেটি কাজ করে সেটি হচ্ছে- সেখানে যদি রাজনীতি জড়িত থাকে তখন মানুষ রাজনৈতিক প্রশ্রয় খুঁজে। এখানে প্রটেকশন আছে কি না? প্রটেকশন যখন সে নিশ্চিত হয় তখন তার মধ্যে আক্রমণের মাত্রাটা অনেক বেশি বেড়ে যায়।
আর মানুষ সামাজিক নীয়ম-নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা অনেক প্রভাবিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আমরা বাংলাদেশের সমাজের মধ্যে একটা অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি। প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক মত কাজ করছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে শুরু করে অন্যান্য যে সংস্থা রয়েছে, সেগুলো ঠিকমত কাজ করছে না। এর ফলে মানুষের মধ্যে আইন হাতে নেওয়ার একটা প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। এগুলো থেকে এক ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে যেখানে অনেকে ভাবছে এই জায়গাটা থেকে আমি পার পেতে পারব। সুতরাং এখান থেকেও একটা মানসিকতা তৈরি হয়। মিডিয়ার মাধ্যমেও মানুষের হিংস্রতা তৈরি হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা আক্রমণগুলো তৈরি হতে দেখি। সোজা কথা জীবন যাত্রা পরিচালিত হচ্ছে কিভাবে, তার কাঠামোটা কি রকম? যে কাঠামোর মধ্যে মানবিক গুণাবলি বিকশিত হওয়ার কোন চর্চা কেন্দ্র নাই। এই জিনিসগুলোর অনুপস্থিতিতে আমরা আমাদের মানুষগুলোকে বড় করতেছি।
কিছু কিছু আক্রমণ তৈরি হয় মানুষের মারাত্মক ধরণের দুর্বলতা থেকে। বাবা যখন তার মেয়েকে জমিজমা সংক্রান্ত কারণে হত্যা করেছে সেটি তার ভলনাবেলেটি থেকে তৈরি হয়েছে। কিংবা যখন একজন মা তার নবজাতক সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যায়- এটি তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক দুর্বলতা থেকে। একটা চাপা ক্ষোভ থেকে আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটা প্রেক্ষাপট এবং সমাজের অনান্য ক্ষেত্রে এক ধরণের সামাজিক অস্থিরতা রয়েছে, যেটা নিরবে কাজ করছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিকগুণাবলীর চর্চা কম হচ্ছে। রাষ্ট্র এ জায়গাতে কোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকে মানুষ অমানুষ হয়ে নৃশংসতা করে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত মানুষ অমানুষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে নানান ধরণের আবেগ থাকে। নেতিবাচক ও ইতিবাচক উভয় ধরণের আবেগ থাকে। সেই আবেগের মধ্যে একটা হতে পারে ক্ষোভ, একটা হতে পারে জিজ্ঞাংসা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা। এখন আমি আরেকজনকে শত্রুতার বশত মেরে ফেলবো, সেটা সহজেই মেরে ফেলতে পারি। তারপরেও নৃশংসতায় যায় কেন? যদি ওই পক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের কোন ক্ষোভ কিংবা তার প্রতি অনেক বেশি ক্ষুব্ধ থাকে সেই ক্ষোভটা প্রকাশ করার ভাষাটা হচ্ছে নৃশংসতা। আমরা অনেক সময় বলি- 'পারলে তোকে আসি কুচি কুচি করে কাটতাম'! এই কথাটা বলার অর্থ আসেলে কী? এর অর্থ হল আমি যেভাবে অনুভব করি, যেভাবে দেখি কোন বিষয়কে। সেই বিষয় দেখার ভুলও হতে পারে বাস্তবও হতে পারে। এখান থেকেই একটা প্রতিক্রিয়া হয়। প্রতিক্রিয়ায় ধরণ সহিংসও হতে পারে।
বৈষম্য ও অসাম্য মানুষের মধ্যে পশুত্ববোধ জাগায়
বিচারে ধীরগতি ও শাস্তি না হওয়ায় ঘটে পাশবিক খুন
বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড সহ নানা অপরাধে নির্মমতা ও পাশবিকতা দেখতে পাওয়া যায়। তবে এই পাশবিকতা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নতুন কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে গরুচোর কিংবা ডাকাতদের পিটুনি দেওয়ার ইতিহাস নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমানে সময়ের পরিবর্তনের সাথে এই পাশবিকতারও পরিবর্তন হয়েছে।পত্রিকা কিংবা গণমাধ্যমে হরহামেশাই নিত্যনতুন পাশবিক হত্যাকাণ্ড সহ নানা অপরাধের খোঁজ মেলে। অপরাধ বিজ্ঞানে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার অধ্যাপক ট্র্যাভিস হিরশি এবং মাইকেল গটফ্রেডসন। তারা তাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অপরাধ কিংবা নেতিবাচক আচরণের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি নিজেকে সংযত করত পারবে কি পারবে না, সেখানে ভূমিকা রাখে তার পরিবার এবং জীবনের শুরুর দিককার নানান ঘটনাপ্রবাহ। তাই একেকজন ব্যক্তির সহিংস আচরণ তার জীবনের এক বা একাধিক প্রপঞ্চের উপর নির্ভর করে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সহিংস ও পাশবিক আচরণের ক্ষেত্র অনেক বেশি বহুমুখী এবং বিচিত্র। সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্য এবং নানান অসাম্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে, তৈরি করে এক ধরণের পশুত্ববোধ; যা ভয়ংকর অপরাধের মধ্যে বের হয়ে আসে। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড ঠিক একই ভাবে বলেছিলেন, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে পশুপ্রবৃত্তি কাজ করে। এই আচরণ সময় সুযোগ পেলে বের হয়ে আসে।ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে অপরাধের কারণে একজনকে শাস্তি দেওয়া হলে, তার প্রভাব সমাজের সব জায়গায় পড়ে। তার শাস্তি দেখে আরেক জন একই ধরণের অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে যাকে অপরাধের ডিটারেন্স তত্ত্ব বলে। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পাশবিক আচরণকে আরো উস্কে দিচ্ছে সমাজে বিচার না হওয়া সংস্কৃতি। বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অপরাধীর শাস্তি না হওয়ার কারণে একজন ব্যক্তি পাশবিক খুন কিংবা অপরাধ থেকে বিরত হয় না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকেই রেহাই পেয়ে যায় বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে।
সব মিলিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশে সময়ের সাথে অপরাধের পরিবর্তন হচ্ছে। যখন ব্যক্তিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক চলক এখানে এসে যুক্ত হয় তখনই অপরাধ হয়ে উঠে আরো অনেক বেশি ভয়ংকর এবং পাশবিক। বাংলাদেশও তার থেকে আলাদা নয়। সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হলে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা গেলে কোন ভাবেই এই পাশবিক আচরণ পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।