এ যেন ট্রেন টু ডেথ: এক দশকে গেল সহস্র প্রাণ

এম.এস.আই খান
সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯


ট্রেন টু পাকিস্তান বইয়ে খুশবন্ত সিং দেখিয়েছিলেন ট্রেন ভর্তি লাস বহনের দৃশ্য। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের সময় দাঙ্গায় হাজারে হাজারে মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সেই লাশ বয়ে নিয়ে গেছিল ট্রেন। সেই দৃশ্য এখন আর না থাকলেও গত দশ বছরে ট্রেন দুর্ঘটনার চিত্র দেখলে মনে হবে এ যেন 'ট্রেন টু ডেথ'। একটি বেসরকারী সংগঠনের হিসাব মতে ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত নয় বছরে রেল দুর্ঘটনায় প্রায় দুই হাজার ২২২ জন নিহত হয়েছেন। সরকারি হিসেবে এ সংখ্যা কম হলেও তা হাজারের নিচে নয়। দেখা যাচ্ছে, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বাহন হিসেবে মনে করা রেলে প্রাণ মূল্য দেওয়ার সংখ্যা মোটেও কম নয়। এই সহস্র মানুষের মৃত্যুর জন্য ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু কারণই সামনে আসছে।  

নয় বছরে এক হাজার ১৬৯ দুর্ঘটনা:
২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এক হাজার ১৬৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেল পূর্বাঞ্চলের পরিসংখ্যান মতে, ২০১০ সালে ২০৪টি, ২০১১ সালে ১৬৫টি, ২০১২ সালে ১৩৮টি, ২০১৩ সালে ১৬৭টি, ২০১৪ সালে ১৪৭টি, ২০১৫ সালে ৮৮টি, ২০১৬ সালে ৬৭টি, ২০১৭ সালে ৭১টি এবং ২০১৮ সালে ৭২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর চলতি বছরের গত ৯ মাসে (৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫০টি। এর মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রেলে নাশকতা ঘটেছিল। ২০১৪ সালে ১৪৭ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যান। তবে ২০১৫ সালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ফলে দুর্ঘটনার পরিমাণও কমে আসে। ওই বছর ৮৮টি রেল দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ ও ২০১৭ সালের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির দেয়া তথ্যমতে ২০১৮ সালে ৩৭০টি ছোট বড় দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।

আট বছরে ক্ষতি প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ:
২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক জাতীয় সংসদে রেল দুর্ঘটনার বিগত ০৮ বছরের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান,  ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত ৮ অর্থবছরে এক হাজার ৩৯১টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ২০৩ জন নিহত ও ৫৮৬ জন আহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৪ টাকা।

সাবেক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হকের উপস্থাপন করা তথ্যমতে, সমগ্র বাংলাদেশে রেলওয়েতে লাইনচ্যুতিসহ মেইন লাইন ও শাখা লাইনে  ২০০৯-১০ সালে ৩০৮টি,২০১০-১১ সালে ২২৪টি, ২০১১-১২ সালে ১৮২টি, ২০১২-১৩ সালে ১৭৬টি এবং ২০১৩-১৪ সালে মোট ২০৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৮৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৪ টাকা।

ব্যয়, লোকবল ও লোকসান:
জানা গেছে, গত ১১ বছরে রেলের উন্নয়নে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে। সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রেলের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার। রেলে যাত্রী সংখ্যাও থাকে উপচে পরা। আর বিশেষ মৌসুমে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না বগিতে। নিষেধ অমান্য করেও যাত্রীদের দেখা যায় ট্রেনের ছাদে। এমন উপচে পড়া যাত্রী নিয়েও ফি বছর গুণতে হয় কোটি কোটি টাকার ভর্তুকি। জানা গেছে, রেলে এখন বছরে লোকসান গুনতে হয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। 

যেসব কারণে দুর্ঘটনা:
বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) তাদের পর্যবেক্ষণে রেল দুর্ঘটনার পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. মোবাইল ফোনে আলাপরত অবস্থায় রেলপথ পারাপার। দুই. রেলপথ সংলগ্ন এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে পথচারীদের সচেতনতার অভাব। তিন. রেলওয়ের অনুমতি ছাড়াই অপরিকল্পিত ও অবৈধ লেবেল ক্রসিং (রেলক্রসিং) নির্মাণ। চার. রেলপথ ক্রসিংগুলোর (সড়ক ও রেলপথের সংযোগ স্থল) কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি। পাঁচ. কিছুসংখ্যক রেলসেতুসহ অনেক স্থানে রেলপথ দীর্ঘদিন সংস্কার না করা। ছয়. দূরপাল্লার ট্রেনগুলোর চালকদের অসতর্কতা। এনসিপিএসআরআর- এর সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এ বিষয়ে বলেন, দেশের মানুষ রেলপথকে সবচেয়ে নিরাপদ ভেবে যাতায়াত করেন। যে কোন মূল্যে রেল দুর্ঘটনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিছু কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে রেল হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

রেল দুর্ঘটনার বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, রেলটাকে আমরা নিরাপদ বাহন হিসেবে মনে করে থাকি এবং আাস্থা ও বিশ্বাস রাখি। এই আাস্থা বিশ্বাসের জায়গায় চির ধরতে শুরু করেছে। রেল দুর্ঘটনা কিন্তু ক্রমে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যেহেতু অল্পসময়ের ব্যবধানে বড় বড় দু-তিনটা দুর্ঘটনা ঘটেছে সে কারণে আমরা মনে করি রেলওয়ের এখনই সজাগ হওয়া উচিত। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বর্তমানে যে পরিমাণ রেলপথ রয়েছে তার ৯০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো মেরামত করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কোচগুলোকে প্রতিস্থাপন করা এবং টেকনিক্যাল যেসব সমস্যাগুলো রয়েছে সিগনাল-বাতিসহ সেগুলোকে আধুনিকায়ন করা। এগুলো যদি করা না হয় তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় বড় দুর্ঘটনা অপেক্ষা করছে।