ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহু পুরোনো । প্রাচীনকাল থেকেই এ উপমহাদেশে বিভিনি জাতির বসবাস ছিল। আর্য-অনার্য, শক, হূণ, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ সেই সাথে ছিল আদিবাসী গোষ্ঠী। খ্রিষ্টীয় ৩য় শতক থেকে মূলত মৌর্য ও গুপ্ত শাসনামল হতে ধর্মের সাথে রাজকার্যের সংযোগ ঘটে। এরপর অশোকের সময়ে ধর্মের প্রচার ও প্রসার, বৌদ্ধ ধর্মের জয়ঢাক এবং সর্বশেষে মুসলিমদের আগমন- ভারতীয়-উপমহাদেশে এক নব অধ্যায়ের সূচনা করে। ইসলাম ধর্ম ভারতীয় উপমহাদেশে বিশিষ্ট স্থান সেই সময় হতে লাভ করেছে। কিন্তু মুঘল, আফগান আর পাঠানরা ক্ষমতায় শীর্ষে থেকেও কখনো রাজ ধর্ম হিসেবে কোন একক ধর্ম কায়েম করেনি।
কিন্তু যখন ব্রিটিশ নীতিতে 'ভাগ কর ও শাসন কর' তত্ত্বটি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয় তখন থেকে ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক ধর্মীয় বিভাজন শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে যে অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল সেটির সংজ্ঞা পুরোটাই পাল্টে যায়। ব্রিটিশ শাসনে বিভাজন নীতি গ্রহন করার পরেও হিন্দু এবং মুসলিমদের একত্রে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আমরা দেখতে পাই-এটির বাস্তব উদাহরণ খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন। কিন্তু এ উপমহাদেশে ধর্মীয় বিভাজন রাজনীতির চূড়ান্ত রুপ লাভ করে ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে। আর এটির বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্টের জন্ম লাভের মধ্য দিয়ে।
দেশভাগের পর অনেক হিন্দু মুসলিম বিশেষ করে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক বিরুপ প্রভাব পড়ে। অনেকে দেশ ত্যাগ করে নিজ বংশ, ভিটেমাটি বিক্রি করে বা ছেড়ে চলে যায়। আবার অনেকে নিজ দেশে রয়ে যায় সংখ্যালঘু থাকা সত্ত্বেও। কেননা তাদের পূর্ব পুরুষদের ভিটেমাটি ও শিকড় ছিন্ন করতে চায়নি। ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতে দুই ধরনের সংখ্যালঘু দেখতে পাই-
ক. ভারত ছেড়ে চলে যায়নি এমন জনগোষ্ঠী( বেশির ভাগ মুসলিম)
খ. ৭১ পরবর্তী বাংলা থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়া জনগোষ্ঠী (হিন্দু প্রধান)
এখন প্রশ্ন কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নাগরিকপঞ্জি? মোদি সরকারের এনআরসি বিষয়টিকে সাধুবাদ জানানোই উচিত। কেননা প্রত্যেক রাষ্ট্রই তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য এরকম উদ্যেগ নিতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে বিরাট জনগোষ্ঠী যারা ভারত জন্মভূমিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে আসছে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণাদি দাখিল করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? এ বিশাল জনগোষ্ঠী কিন্তু ভারত মাতাকে মনেপ্রাণে ধারন ও লালন করে হোক সে মুসলিম অথবা অন্য কোন সম্প্রদায়ের। যারা নিজ জন্মস্থানকে ভালবেসে রয়ে গিয়েছিল তারা যে পরবর্তী শতকে এসে এরকম নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রমাণাদি প্রদর্শন করতে হবে তা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।
মোদি সরকার যদি ভারতীয়দের মধ্যে ধর্মীয় একক আধিপত্য স্থাপিত করতে চায় সেটি হিতে-বিপরীত হবে। বিজেপি সরকার যে নতুন আদর্শ 'হিন্দুজম' প্রতিষ্ঠা করতে চায় এনআরসি'র মাধ্যমে সেটিও ভুল পদক্ষেপ হবে। কেননা তাতে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোতে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় । এছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ভারতীয় একক সত্তা গান্ধী-নেহেরুর যে স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হবে না ।
একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে। ১৯৫০ ও ষাটের দশকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ছিল ঘোলাটে । ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকায় একটি নতুন আইন পাশ করা হয় যেটি 'Ceylon Citizenship Act ' বলা হয়। এই আইনের বলে শ্রীলংকার তামিল জনগোষ্ঠীকে শ্রীলঙ্কান নাগরিক হিসেবে বাদ দেওয়া হয় এবং তাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা রহিত করা হয়। এই আইনে আরো বলা হয় যাদের তিন পুরুষ শ্রীলঙ্কায় বসবাস করে আসছে তাদেরই কেবল নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই নাগরিক আইনটি শ্রীলংকার ইতিহাসকে রক্তাক্ত করেছিল। দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিল। এই তামিল জনগোষ্ঠী 'EELAM' সংগঠনের মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল। দীর্ঘ তিন দশক দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান ছিল ।
বিজেপি যদি এই বিলটি সংশোধনসহ উচ্চকক্ষে পাশ করে তাহলে ভারতীয়দের মধ্যে ২ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। প্রথমত, ভারতীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীদের প্রবল চাপ ও প্রতিবাদ; দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর চাপ বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর। আসাম ভিত্তিক দ্য সেন্টিনাল খবরের কাগজে লেখা হয়েছিলে যে, এই আইনের কারণে ভারতের অন্য প্রদেশগুলোর তুলনায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেশি প্রভাব পড়বে। আসামে বিজেপি'র মুখপাত্র মেহদি আলম বোড়া এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "বিলটি আসামের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য সংকট ডেকে আনবে এবং আসাম চুক্তিকে অকার্যকর করতে দেবে।"
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আসামের দৈনিক গৌহাটি অসমীয়া প্রতিদিন কাগজে লেখা হয়েছিলো. "নাগরিকত্ব বিলের সংশোধনী পাশ হলে আসাম চুক্তি পুরোপুরি মূল্যহীন হয়ে পড়বে।" অর্থাৎ ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে পড়বে। আসামে বেশিরভাগ ই ছিল বাঙালি হিন্দু বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এবং এরা বাংলাদেশকে থেকে এসেছে। তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করলে আসামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার ভয় রয়েছে। নর্থ ইষ্ট স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন' এর নেতা প্রিতমবাই, সোনাম সেন্টিনাল কাগজে উল্লেখ করেন, "বিলটি আদিবাসীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।" অর্থাৎ মোদিজির সরকার কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারবে না। একদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের রোষানল অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরোধিতা- দুই ই মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাড়াবে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাস করা ভারত মাতার যে সন্তানগুলো (হোক সে মুসলিম অথবা হিন্দু অথবা অন্যকোন সম্প্রদায় )মেধা ও পরিশ্রমের দ্বারা ভারত ভূমির জয়গান গেয়ে যাচ্ছে তাদের বাদ দিয়ে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখাটা কতটুকু যৌক্তিক সেটির প্রশ্ন রয়ে যায়। অবশ্যই মোদি সরকার তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয় বরং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ভারত মাতার অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখবে।
মোদি সরকার যদি একক কোনো গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে বা রাজনীতির পাশার দান হিসেবে এনআরসি কে ব্যবহার করতে চাই সেটি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা সময় ই বলে দিবে। তবে ইতিহাসের পুনঃরাবৃতি ঘটলে মোদি সরকারের ভবিষ্যৎ দাবার ' রাজা চেকমেট' এর মতন বড় রকমের ধাক্কা খাবে।