ঢাবির প্রথম মহিলা হোস্টেলকে 

‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল

এম.এস.আই খান
রবিবার, ২৩ জুন ২০১৯


আজ নারী জাগরণের কবি সুফিয়া কামালের জন্মদিন। ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতার নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তাঁর বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্দি জীবন কাটাতে হতো। স্কুল-কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না।

পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ একরকম নিষিদ্ধ ছিল। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। কবির শৈশব কেটেছে নানা বাড়িতে। সুফিয়ার বয়স যখন সাত বছর বয়স তখন তাঁর বাবা সাধকদের অনুসরণে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে তার মা সাবেরা খাতুন বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।

সুফিয়ার মা ছিলেন শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের মেয়ে। সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। এ কারণে অন্দরমহলে মেয়েরা উর্দু, আররী, ফার্সীর চর্চা করতো। সেখানে বাংলার চর্চা খুব একটা হত না। তবে সুফিয়া কামাল তার মায়ের কাছ থেকে বাংলা শেখেন এবং বাংলা বই পাঠেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নানাবাড়িতে থাকা বড় মামার সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের বই পড়ারও বড় সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এভাবে পারিবারিক নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন।

মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে মাত্র ১৩ বছর বয়সে (১৯২৪ সালে) সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। তবে নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক থাকায় তিনি স্ত্রী সুফিয়াকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ প্রদান করেন।  ফলে সুফিয়া বাংলা সাহিত্যের চর্চা শুরু করেন এবং লেখালেখিতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। 

১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা 'বাসন্তী' তৎকালীন প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ১৯৩২ সালে সুফিয়া কামালের বয়স যখন একুশ তখন তাঁর সাহিত্য সাধনায় প্রেরণাদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যুতে কবির জীবনে নেমে আসা প্রচণ্ড শূন্যতা তিনি লিখেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘‘তাহারেই পড়ে মনে”।

জীবেনের সকল উত্থান-পতনকে কবি তাঁর কলমে স্থান করে নেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। ১৯৩৭ সালে তাঁর গল্পের সংকলন কেয়ার কাঁটা প্রকাশিত হয়। তার লিখিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭), প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮), উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪), দিওয়ান (১৯৬৬),অভিযাত্রিক (১৯৬৯), মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০), মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)। 

এর মধ্যে ১৯৩৮ সালে কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়ার মুখবন্ধ লেখেন। বইটি বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়ায় যাদের মাঝে ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। এদিকে স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর ফলে কবি আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং সেখানে পল্লী কবি জসীমউদ্দীন ও প্রাবন্ধিক আবদুল কাদিরের পরিচয় হয়। ১৯৩৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের লেখক ও অনুবাদক কামালউদ্দিন আহমেদকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সেই থেকে তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিত হন।

বিয়ের কয়েক বছর পর ১৯৪২ সালে স্কুলে শিক্ষকতার ইতি টানেন। পরবর্তীতে সাহিত্যক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার কাজ করেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার আত্মপ্রকাশ করেন। সুফিয়া কামাল ওই পত্রিকাটির সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ছায়ানট, কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

কলকাতায় অবস্থানকালে সুফিয়া কামালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও বেগম রোকেয়াসহ নানা জ্ঞানী-গুণী মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। দেশবিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসলেও বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার নামে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান।

পাকিস্তানের নানা বৈষম্য ও দমননীতিরও বিরোধী ছিলেন সুফিয়া কামাল। পাকিস্তানের নানা বৈষম্য ও দমননীতিরও বিরোধী ছিলেন সুফিয়া কামাল। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছিল।

১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেছিলেন। কিন্তু বাঙালিদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালে তিনি তা বর্জন করেন। তিনি তাঁর লেখা ও কাজের মধ্য দিয়ে নানাভাবে রাজনীতিবিদ,সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। এ জন্য বাংলার মানুষ তাঁকে “জননী সাহসিকা” উপাধিতে ভূষিত করেছে।

এ ছাড়াও কবি তাঁর কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬) ও নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদকসহ  ৫০টিরও বেশি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ৮৮ বছর বয়সে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তাকেই প্রথম পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুর পরে তার সম্মানে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কবি সুফিয়া কামাল হল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একটি ছাত্রী হল নির্মাণ করা হয়েছে। যা ২০১৫ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টির মেয়েদের ৭ম হল হিসেবে চালু হয়েছে। জন্মদিনে বাংলা রানারের পক্ষ থেকে কবির জন্য রইলো শুভেচ্ছা ও প্রার্থনা- “তুলি দুই হাত করি মোনাজাত, হে রহিম রহমান।”