শিরোনাম
বিশ্ব ইতিহাসে বহু কালজয়ী ভাষণ ও বক্তৃতা রয়েছে যে ভাষণের মধ্য দিয়ে নেতারা লাভ করেছেন অমরত্ব। তবে সব ভাষণ ও বক্তৃতা সমান তাৎপর্য ও মর্যাদা বহন করে না। যে ভাষণের মধ্য দিয়ে একটি জাতি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পেতে পারে, জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা বিনির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়ে, এমনকি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনতে পারে, এমন ধরনের ভাষণই বিশ্ববাসী ব্যতিক্রম ভাষণ বলে মনে করে। এই প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণটি অনন্য। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা, বাগ্মিতা, অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা, সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীতার নিরিখে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এ ভাষণ ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ভাষণটি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আবাল বৃদ্ধ বণিতাসহ সর্বস্তরের মানুষকে এক পতাকাতলে সমবেত করে।
মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই দীর্ঘ বন্ধুর পথে বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম সাহস, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সঠিক দিকনির্দেশনা জাতিকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে দেয়। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণটি ছিল মূলত বাঙ্গালির মুক্তির সনদ।
জাতির জনকের জন্মশতবর্ষে অর্ধ শতবর্ষ পূর্বে দেওয়া তাঁর দিকনির্দেশনা আজও বাঙালি জাতিকে যেন ধ্রুবতারা হয়ে পথ দেখায়। শ্রীকৃষ্ণ যেমন মহাভারতের যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে অর্জুনকে ব্রহ্মজ্ঞান দান করেছিলেন ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ তাঁর ১৮.৩১ মিনিটের ভাষণে বাঙালি জাতিকে মুক্তির পূর্ণ রূপরেখা দেখিয়েছিলেন। যে ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তির পথ তুলে ধরেছিলেন সে ভাষণ আজ আর কেবল বাঙালির জন্য নয় বরং সমগ্র বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সনদ। তাই UNESCO তাঁর এই ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর Memory of the World Register-এ অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়াও বৃটিশ গবেষক জ্যাকব এফ ফিল্ড তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ "We Shall Fight on the Beaches: Speeches that Inspired History" (2013) -এ অন্তর্ভুক্ত করেন, যেখানে স্থান পেয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৪১ টি ভাষণ।
ভাষণের শুরুতেই তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বাঙালির বৈষম্যের ইতিহাস তুলে ধরেন। আর বাঙালির অস্তিত্বের স্বকীয়তা রক্ষার প্রয়োজনীতা তুলে ধরেন। তিনি আগেই জ্ঞাত হয়েছিলেন যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে বিরাট রক্তপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ পাকিস্তানি মিলিটারি তখন চতুর্দিকে এমনকি হেলিকপ্টারে করেও সশস্ত্র পাহারা দিচ্ছিল। তাই তিনি সকলের পরামর্শ সত্ত্বেও 'বাংলাদেশ স্বাধীন' কথাটি বলেননি। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি বরং যুদ্ধের রণকৌশলও বর্ণনা করেছেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের সাথে প্রশাসনিক, সামরিক, বিচার বিভাগীয়, আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক অসহযোগিতার ঘোষণা দেন। আবার সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে রেল, গণপরিবহন, বন্দর চালু এবং ব্যাংক কেবল বেতন তুলতে দুই ঘণ্টার জন্য খোলা রাখার নির্দেশ দেন।
তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, একটি টাকাও যেন পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার না হয়। একদিকে যেমন পাকিস্তানি শোষক সরকারের অসহযোগিতা শুরু হয় তেমনি শাসন, বিচার ও শৃঙ্খলা বিষয়ক যাবতীয় সিদ্ধান্ত তাঁর নেতৃত্বে চলে আসে। ফলে ৩২ নম্বর বাড়ি হয়ে ওঠে অস্থায়ী সচিবালয় আর তিনি হয়ে ওঠেন দেশের ডি ফ্যাক্টো সরকার। তিনি বাঙালিকে যে দৃঢ়কন্ঠে রণকৌশলের দিকনির্দেশনা দেন তা ছিল বিন্দুতে সিন্ধু বর্ণনার মত অনবদ্য আর শক্তি ও সাহস যোগাতে অনন্য। তিনি এভাবে বলেন, 'আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।' অর্থাৎ তিনি সর্বতোভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতির আহবান জানান। আর একাগ্রতার উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন 'রক্ত যখন দিয়েছি, আরও দেব। তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।'
সর্বশেষ তিনি ঘোষণা করেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' অর্থাৎ 'বাংলাদেশ স্বাধীন' শব্দ দুটি ছাড়া তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন কোন দিকনির্দেশনা নেই যা উল্লেখ করেননি।বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। কোনো ধরনের আপোসের পথে না গিয়ে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসে নজীরবিহীন। এ ভাষণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নেতৃত্বের সর্বোচ্চ দেশাত্ববোধ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির এবং লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি। সময়ের পরিসীমায় গণ্ডিবদ্ধ না থেকে তা হয় কালোত্তীর্ণ ও প্রেরণাদায়ী।
এ ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর কাব্যিক গুণ-শব্দশৈলী ও বাক্যবিন্যাস, যা হয়ে ওঠে গীতিময় ও চতুর্দিকে অনুরণিত। যে কোনো শ্রেষ্ঠ ভাষণই উত্থিত হয় বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে, ফলে তা তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও হৃদয় উৎসারিত বলা যায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণও ছিল তাই, যা লিখিত ছিল না। ভাষণটি আকারে ছিল নাতিদীর্ঘ,মাত্র ১ হাজার ১৩৫ শব্দের। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির মনে যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ গর্জন করছে তখন পুনরায় উনুন স্থাপনের দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ একটি জনগোষ্ঠীর মুক্তির কালজয়ী এক মহাকাব্য। এ ভাষণে তাঁর তেজস্বিতা ও সম্মোহনী ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। এ ভাষণ পাল্টে দিয়েছে একটি দেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত। এ ভাষণেই তিনি কেবল অগ্নি সংযোগের ক্ষেত্র আর পদ্ধতিগুলোই বলেছেন। যাতে করে সর্বশুচি অগ্নিতে স্নাত হয়ে পবিত্র জন্মভূমি পায় প্রকৃত মুক্তি।
রনি মুহাম্মদ: কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????