Bangla Runner

ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১ | বাংলা

শিরোনাম

মানুষের হাড়, খুলি, কঙ্কালে তৈরি হয়েছে যে গীর্জা কান্নার গল্প রেখে গেলেন হাসির বিজ্ঞাপনের মাসুদ আল মাহদী অপু মানুষ থেকে পাথর হয়ে যাচ্ছে এক শিশু নিয়মিত সাহিত্যবিষয়ক লেখা প্রকাশ করছে দূর্বাঘাস ত্বকী: একটি বিচারহীনতার প্রতীক পার্কের দাম একটি আস্ত শহরের চেয়েও বেশি! বঙ্গবন্ধুর মননে পিছিয়ে পড়া মানুষ নীতিতে আপোষহীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শতবর্ষে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ঢাবি আলাদিনের প্রদীপে ভয়ঙ্কর ফাঁদ
Home / ভ্রমণ বিলাস

বেড়ানো

টলটলে নীল জলে

শান্তনু চৌধুরী
বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ Print


ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। টলমলে নীল জল তির তির করার সৌন্দর্য, সাদা মেঘ আর বৃষ্টির বাড়াবাড়ি, পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমানোর গল্প, ঢেউয়ের তালে নৌকা বাজানোর গল্প নাকি পানকৌড়ি, লালঝুঁটি বা ভুতিহাঁসের ভেসে বেড়ানো। প্রাণ জুড়ানোর এসব গল্পই সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের লিলুয়া বাতাসে প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দেয়ার। তাহলে বরং শুরুর গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। পড়িমরি করে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বন্ধু ছুটছি পারাবত এক্সপ্রেসের দিকে। যাত্রা প্রথমেই সিলেট। বন্ধুরা এক হওয়ার মানেই হাসি আড্ডা গান আনলিমিটেড। আর যেহেতু আমরা শাটল ট্রেনের বগি বাজিয়ে গান করেই অভ্যস্ত। সেই পুরনো অভ্যাসটা এখানেও ঝালিয়ে নিচ্ছি।

বাইরের শীতল পরশ বলে দিচ্ছে ছায়াঘেরা পথে ঢুকে পড়েছে আমাদের ট্রেন। জানালা দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি কাছে দূরে সারি সারি চা বাগান। কোথাও কোথাও পরিচিত কর্পোরেট কোম্পানির সিল মারা। সিলেটে নামার পর সেদিন আমরা হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার দেখলাম। এ ছাড়া মূলত বিশ্রামেই কেটেছে সময়। পরদিন ভোরের দিকে যাত্রা সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের দিকে। কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া বন্যায় রাস্তাঘাট খারাপ। তাহিরপুরের বাজারঘাটায় নৌকা আগেই ঠিক করে রাখা ছিল। একে একে উঠে পড়লাম। শুরু হল হাওরের পথে যাত্রা। 

ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ কিছুটা ব্যাঘাত ঘটালেও শৈশবের নদীকূলে বেড়ে ওঠার স্মৃতি যেন আবারও জাগিয়ে দিচ্ছে নাগরিক মনকে। মাঝে মাঝে শব্দ করে চলে যাচ্ছে অন্য নৌকা। কূলবঁধু নাইওর যাওয়ার দৃশ্য। নৌকার সামনে গেট বানিয়ে বরযাত্রী যাওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়ল। এখানে ওখানে দ্বীপের মতো চর, হাঁসের ঝাঁক। সাঁতরে রাখাল গরুর পাল নিয়ে পার হচ্ছে নদী। গৃহস্থবাড়ির বউরা স্নান সারছেন। এসব দেখতে দেখতেই আমরা এ নদী সে নদী খাল-বিল পেরিয়ে পড়লাম বহুল নাম শোনা জাদুকাটা নদীতে। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া এই নদীর স্বচ্ছ নীল জলে দেখা যায় গভীর নদীর তলদেশ পর্যন্ত। নদীর তীরে সবখানেই দেখা যাচ্ছে বড় পাথর খণ্ড। আমরা নামলাম নদীটির পাশেই প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতার বারেক টিলায়। 

চরে নামতেই শুরু হল আমাদের উল্লাস। এরপর পানিতে দাপাদাপি। ডুব-সাঁতার। স্থানীয়রা নদীর গভীরতা সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বেশিদূর না যেতে বারণ করলেও সেটা যেন শোনার সময় নেই। দুপুরের বিশ্রামের পর আমরা উঠলাম বারেকের টিলায়। ওপারে মেঘালয়। পাথর আর কাঁটাতার দিয়ে সীমানা স্পষ্ট। নদীর জল সীমানা বুঝে না তাই গড়িয়ে চলে মনের আনন্দে। বারেকের টিলা থেকে পুরো নদী, পাহাড় আর চরের দৃশ্যটা কতটা নয়ন জুড়ানো তা না দেখলে বা অনুভব না করলে বোঝানো মুশকিল। বিকালে পৌঁছলাম টেকেরঘাটে। সেখানেই রাতযাপন। রাতে নৌকায় আয়োজন বার-বি-কিউ পার্টি। ফানুস উড়ানো। আর বন্ধুদের কণ্ঠে হরেক রকম গানে নস্টালজিক হয়ে যাওয়া। জলের মাঝে নৌকায় রাত কাটানোর অনুভূতি জীবনের নতুন পাওয়া যেন।

আশপাশ থেকে ভেসে আসছে গান। দূরে পাহাড়ের গায়ে আলো জ্বলে উঠতেই বুঝলাম সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বসবাস। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ছুটলাম চুনাপাথর উত্তোলনের পর সৃষ্টি হওয়া নীল জলের নীলাদ্রি লেক দেখব বলে। লেকের পাড়ে অনেক টিলা। অনেকে এটিকে বাংলার কাশ্মীরও বলে থাকেন। এখনও পুরনো রেললাইন কালের সাক্ষী হয়ে আছে। তবে সেটিকে আরও সাজানো যেত চাইলে। এসব দেখতে দেখতে সূর্য একরাশ হাসি নিয়ে জেগে উঠে পাহাড়ের বুক চিরে। আমরা চললাম মূল টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে। চারদিকে এত এত পানি যে কোনটা খাল, কোনটা নদী বোঝা মুশকিল। মাঝে মাঝে অবশ্য পানির নিচ থেকে মাথা উঁচু করে কোনো কোনো গাছ নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। জানিয়ে দিচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে সেখান দিয়ে লোকজন হেঁটে বাড়ি ফিরে। হাওরের সময়টা উপভোগ করব বলে নৌকার সামনে পা ঝুলিয়ে বসলাম। 

ঢেউয়ের তালে চলছে নৌকা। স্বচ্ছ জল ধুয়ে দিচ্ছে পা। নৌকা চলতে থাকুক এই ফাঁকে জেনে আসি টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে কিছু তথ্য। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ১৮ মৌজায়, ৫১টি জলমহালের সমন্বয়ে নয় হাজার ৭২৭ হেক্টর অঞ্চল নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর গড়ে উঠেছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় জলাভূমি। মেঘালয় পর্বত থেকে প্রায় ৩০টি ঝরণা এসে সরাসরি মিলেছে হাওরের পানিতে। এটি মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর অভয়াশ্রম। জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের সুনাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ মিঠা পানির এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার অঞ্চল। স্থানীয়ভাবে ছয়কুড়ি কান্দা আর নয় কুড়ি বিল নামে পরিচিত এই বিশাল জলাভূমি শুধু পাখি নয়, মাছের জন্যও বিখ্যাত। এ হাওরের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হল বিভিন্ন জাতের পাখি। ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলছে। হাওরজুড়ে শেষ বর্ষার পানি এখনও থইথই করছে।

 à¦¹à¦¾à¦“রের প্রবেশ মুখেই সারি সারি হিজলগাছ যেন অভিবাদন জানাচ্ছে। পানির ঢেউ, থৈ থৈ জলরাশি সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। নৌকা চলছে। ডানা ঝাপটিয়ে সাঁতার কাটছে কতশত পানকৌড়ি। ছোট্ট সরু ঠোঁটে মাছ নিয়ে উড়ে যায় মাছরাঙা। হিজল, করচ আর নলখাগড়ার বন। গাছে গাছে বসে আছে একঝাঁক শালিক। পানি বইছে ছলাৎ ছলাৎ। নীল আকাশের সাদা ভেলায় সেজেছে হাওরের পানিও। এসব দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে। সেখানে গাছের সঙ্গে নৌকা বেঁধে নেমে পড়া স্বচ্ছ পানিতে। এরপর ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পুরো হাওরটা পাখির চোখে একনজর দেখা। এর মাঝে বৃষ্টি হলে সৃষ্টি হয় ভয় পাইয়ে দেয়ার দৃশ্য। স্থানীয়রা বলেন, এটিই জীবন। মেঘ বৃষ্টি রোদের খেলা। পানিতে দ্বীপের মতো ভেসে থাকা সবুজ-শ্যামল গ্রামগুলো রাতের বেলা যেন জেগে ওঠে। সন্ধ্যায় ঘরে জ্বালানো কুপিবাতি হাওরের বাতাসে নিবু নিবু জ্বলতে থাকে। ভেসে আসে নানা রকমের গান। কারণ বাউল সাধক মরমি অনেক কবির জন্মই যে এই সুনামগঞ্জে। তবে সেখানে হাওরের জীবনের দুঃখগাথাই বেশি।

কীভাবে যাবেন: à¦†à¦®à¦¾à¦¦à§‡à¦° নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকায় সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম। সুনামগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেল অথবা সিএনজিতে যেতে হবে তাহিরপুর। তাহিরপুর বাজার ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে সরাসরি টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া যাবে। তবে সবকিছুর দরদাম করতে ভুলবেন না।

কোথায় থাকবেন: à¦Ÿà¦¾à¦™à§à¦—ুয়ার হাওরে বেড়াতে গেলে নৌকায় রাত কাাটানো সবচেয়ে মজার। তবে থাকা যায় ওয়াচ টাওয়ারের পাশেই রেস্ট হাউসে অথবা টেকেরঘাটে। আবার দিনে দিনে হাওর ঘুরে রাতটা তাহিরপুরেও কাটানো যায়। তবে সে ক্ষেত্রে আগে থেকে যোগাযোগ করে সব ঠিক করে রাখা ভালো।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2021 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon