Bangla Runner

ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১ | বাংলা

শিরোনাম

মানুষের হাড়, খুলি, কঙ্কালে তৈরি হয়েছে যে গীর্জা কান্নার গল্প রেখে গেলেন হাসির বিজ্ঞাপনের মাসুদ আল মাহদী অপু মানুষ থেকে পাথর হয়ে যাচ্ছে এক শিশু নিয়মিত সাহিত্যবিষয়ক লেখা প্রকাশ করছে দূর্বাঘাস ত্বকী: একটি বিচারহীনতার প্রতীক পার্কের দাম একটি আস্ত শহরের চেয়েও বেশি! বঙ্গবন্ধুর মননে পিছিয়ে পড়া মানুষ নীতিতে আপোষহীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শতবর্ষে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ঢাবি আলাদিনের প্রদীপে ভয়ঙ্কর ফাঁদ
Home / বই আলোচনা

কী আছে কন্যার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে?

রেজওয়ানা শারমিন রীতি
শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১ Print


১৯৯৯ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতে সাহিত্যম প্রকাশনালয় থেকে শেখ হাসিনা রচিত প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলামের ভূমিকা-সমৃদ্ধ ও পার্থ ঘোষের অনুদীর্ঘ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটি। বইটি মূলত শেখ হাসিনা লিখিত স্মৃতিকথামূলক সংক্ষিপ্ত আত্মজৈবনিক রচনা। যাতে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক অনুল্লিখিত দিক ও জননেত্রী শেখ হাসিনার লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা দশটি প্রবন্ধ এই বইতে চারটি পর্যায়ে দশটি শিরোনামে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। পর্যায়গুলোর হলো - বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও পারিবারিক কথা,স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ছেঁড়া ছেঁড়া ছবি।

প্রথম তিনটি পর্যায়ে আছে তিনটি করে প্রবন্ধ এবং শেষটিতে রয়েছে একটি। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধাবলী যা ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে লেখা, এগুলো বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বা সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল। তা থেকে একজন গভীর সংবেদনশীল লেখিকার অন্তর্দৃষ্টি সচেতন মন-মানসিকতার পরিচয় মেলে। এই বইতে সংকলিত প্রবন্ধাবলী পাঠ করলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কিছু স্মৃতি এবং ১৯৭৫-৯৫ দুই দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়।

‘‘শেখ মুজিব আমার পিতা’’ সংকলনের প্রতিপাদ্য শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন নয় বরং দেশের সংঘতময় সময়ে রচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধাবলীতে তার দৃষ্টিভঙ্গি। "শেখ মুজিব আমার পিতা" বইটিতে "শেখ মুজিব আমার পিতা", " বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবাহিনী" এবং " ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড" তিনটি প্রবন্ধই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা।শেখ হাসিনা শুধু মেয়ে হিসেবেই নন,রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী হিসেবেও ছিলেন বাবা মুজিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সেই ঘনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বাবা সম্পর্কে শোনা-দেখা নানা ঘটনার মালা গেঁথেছেন "শেখ মুজিব আমার পিতা" প্রবন্ধে।


শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটি পড়ছেন রেজওয়ানা শারমিন রীতি, ঢাকার দীপনপুর থেকে তোলা

প্রবন্ধে লেখিকা মধুমতী নদীর শাখা নদী বাইগার নদীর তীর ঘেষে গড়ে ওঠা টুঙ্গিপাড়ার বর্ননা এবং সেখানে তার পিতার বেড়ে ওঠার ও অসহায়দের সাহায্য করার কাহিনী তুলে ধরেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলে থাকা অবস্থাতেই দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ছাতা,বই এমনকি নিজের গায়ের পাজামা-পাঞ্জাবি দিয়েও সাহায্য করতেন। দূরে যাদের বাড়ি তাদেরকে নিজ বাড়িতে খাওয়াতে নিয়ে আসতেন।কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে এসে হলওয়ে মুভমেন্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং এই সময় থেকেই তার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয়।                  

“বঙ্গবন্ধু ও তার সেনাবাহিনী” 
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকরার জন্য যে সমগ্র সেনাবাহিনীকে দোষারোপ  করা হয় তার প্রতিবাদ করেছেন এবং একটি আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনের জন্য শেখ মুজিবের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন। শেখ হাসিনার মতে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রে কিছু বিপথগামী উচ্চাভিলাষী অফিসারের হাতে প্রাণ দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং এই কুচক্রীমহল বাংলাদেশের প্রগতির ধারা পালটে দিতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের ক্ষমতা গ্রহন করার পরে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও দুভিক্ষের সময়ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্রসম্ভার সংগ্রহ করেছেন এবং তাদের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছেন।

“ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড”
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের এবং হত্যাকারীদের তৎকালীন সরকারের মদদদানের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।প্রধান সেনাপতি মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজউদ্দৌলা যেমন পরাজিত হয়েছিল একইভাবে মন্ত্রীপরিষদের সদস্য খন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় যা স্বাধীন বাংলার মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যকে হত্যা করার নামান্তর।

“স্মৃতির দখিন দুয়ার”
প্রবন্ধে লেখিকা ১৯৭২ সালে ধানমন্ডি ১৮ নাম্বার বাড়িতে তাদের গৃহবন্দীদশার কথা বলেছেন এবং একইসাথে শৈল্পিক বর্ণনায় টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ জীবনযাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পন করলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়া  হয়নি এবং তাদের সাথে যারা দেখা করতে আসছিলেন তাদেরকে গুলি করা হচ্ছিল। ঘরে বসেই শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সবাই শত্রুদের শেষ তান্ডব দেখছিলেন। ১৭ ডিসেম্বর দেশি বিদেশি বিভিন্ন সাংবাদিক ও ব্যক্তিদের প্রভাবে তাদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং ঘর থেকে বের হয়েই বেগম মুজিব পাকিস্তানি পতাকা ঘরের ওপর থেকে খুলে এনে তা পা দিয়ে মাড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেন। এই প্রবন্ধের অন্য বর্ণনায় শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ মানুষের সরল জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছা ছিল শেষ জীবনে মেয়ে শেখ হাসিনার কাছে টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে থাকবে। বাবার ইচ্ছার সাথে একসুরে শেখ হাসিনাও বলেছেন - “আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আমি টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে নদীর ধারে ঘর বানিয়ে থাকতে চাই।”

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ

“স্মৃতি বড় মধুর, বড় বেদনার” 
প্রবন্ধে লেখিকা মুক্তিযুদ্ধ এবং তাদের পারিবারিক মধুর ও বেদনার স্মৃতিগুলো তুলে ধরেছেন। একইসাথে তার মা বেগম মুজিবের টাকা জমিয়ে এবং হাউজ বিল্ডিংয়ের থেকে লোন করে ধানমন্ডি ৩২ বাড়িটি তৈরি করা, আন্দোলনের সময় নিজের গয়না বিক্রি করে সংগঠনকে দান করার মাধ্যমে যে নিঃস্বার্থতার পরিচয় ফুটে উঠেছে,শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় কান্না চেপে রেখে তার জন্য কাপড়চোপড়, বইপত্র, লেখার কাগজ, তামাকের কৌটা গুছিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যে অসীম ধৈয্যের পরিচয় ফুটে উঠেছে তা তুলে ধরেছেন।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গুলিতে ঝাঝড়া হয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র,লুট হয়ে গিয়েছিল বাড়িতে থাকা বইপত্র,সোনা গয়না সহ অনেক মূল্যবান জিনিস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্য খুন হওয়ার পর ১৯৮৭ সালে শেখ হাসিনা আবার ধানমন্ডি ৩২ বাড়িটিতে ঢুকতে পারেন এবং বাড়ির প্রতিটি জিনিস দেখে বেদনায় কাতর হয়ে পড়েন।

এরপর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাড়িটিকে জাদুঘর হিসেবে দান করেন কারন তারা মনে করেন তাদের পিতা শুধুমাত্র তাদের একার পিতা নন,তিনি সমস্ত জনগনের তাই তার স্মৃতি জনগণকে দান করেন। বইটির পরবর্তী পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের সংকটপূর্ণ মুহূর্তে ৩ জন ব্যক্তির কৃতিত্বের কথা তুলে ধরেছেন।একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী, একজন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও একজন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেন। ড.আব্দুল মতিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর চাকরিচ্যুত হন এবং গ্রেফতার হন।শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরে তার কাছেই পিতৃস্নেহ পান এবং ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেখ মুজিব হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন করে গেছেন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে লেখিকা নিজের মিল খুঁজে পেয়েছেন কারন জাহানারা ইমাম একজন সন্তানহারা মা আর তিনি নিজে স্বজনহারা।গণ-আন্দোল, ঘাতক-দালাল নির্মুল সমন্বয় কমিটির আন্দোলন চলাকালে যে কোন প্রয়োজনে জাহানারা ইমাম শেখ হাসিনার কাছে ছুটে এসেছেন। এই শহীদ জননী শেষ পর্যন্ত দেশদ্রোহীর অপবাদ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন যার জন্য তৎকালীন সরকারকে ধিক্কার দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা। 

নূর হোসেনকে লেখিকা প্রথম দেখেন এরশাদের পদত্যাগের দাবী মিছিলে বুকে পিঠে স্বৈরাচার বিরোধী কথা লেখা অবস্থায় এবং শেখ হাসিনা তখন তাকে শার্ট পড়তে বলেন কারন তিনি বলেন - “আমি আর শহীদ চাইনা, আমি চাই গাজী” এরপর গুলিতে নূর হোসেনের মৃত্যু হলে লেখিকা তার প্রশংসা করে বলেন - “তুমি প্রতিবাদের প্রতীক, তুমি আজ পোস্টার হয়ে রয়েছো প্রতিটি মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে।”

সর্বশেষ প্রবন্ধ “একানব্বইয়ের ডায়রি” 
এই প্রবন্ধে লেখিকা ১৯৯১ সালের সাইক্লোনে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের কথা বলেছেন।তখনকার উপকূল অঞ্চলের পরিবেশকে তিনি পাকিস্তানীদের বন্দিদশা থেকে ফেরত আসা বীরাঙ্গনাদের করুন অবস্থার সাথে তুলনা করেছেন। সবশেষে বলা যায় যে, " শেখ মুজিব আমার পিতা" গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু ললনা শেখ হাসিনা ১৯৮৩-'৯৫ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকটময় অবস্থা তুলে ধরেছেন এবং তৎকালীন সরকার কর্তৃক ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে ইতিহাসের সত্যতা একইসাথে বঙ্গবন্ধুর জীবনের জানা অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন।

রিভিউদাতা: শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
retey717@gmail.com

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2021 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon