Bangla Runner

ঢাকা , রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪ | বাংলা

শিরোনাম

অনুর্ধ্ব ত্রিশ বয়সীরা বক্তব্য দিয়ে জিতুন ৬০ হাজার টাকার পুরস্কার রম্য বিতর্ক: ‘কুরবানীতে ভাই আমি ছাড়া উপায় নাই!’ সনাতনী বিতর্কের নিয়মকানুন গ্রীষ্ম, বর্ষা না বসন্ত কোন ঋতু সেরা?  বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ই-মেইল বিশ্বের সবচেয়ে দামি ৫ মসলা Important Quotations from Different Disciplines স্যার এ এফ রহমান: এক মহান শিক্ষকের গল্প ছয় সন্তানকে উচ্চ শিক্ষত করে সফল জননী নাজমা খানম ‘সুলতানার স্বপ্ন’ সাহিত্যকর্মটি কি নারীবাদী রচনা?
Home / ক্যাম্পাস

চীনের কান্না হোয়াংহো, ঢাবির কান্না গণরুম

এম.এস.আই খান
শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ Print


86K

এক বুক স্বপ্ন নিয়ে রাজধানী থেকে বহু দূরের কোন গ্রাম বা শহর থেকে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন, তাদের অনেকেরই প্রথম স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয় 'গণরুম-গেস্টরুম'। এ যেন ঠিক চোরাই পথে বিদেশ যাত্রার মত। নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে মধ্যপ্রাচের কোন দেশে গিয়ে à¦¦à¦¾à¦²à¦¾à¦²à§‡à¦° হাতে যেভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন, অনেকটা তেমন অবস্থা দাঁড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। চীনের দুঃখ যেমন হোয়াংহো নদী তেমনি গণরুম-গেস্টরুমেকে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃখ'  হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার সময় তার নামের পাশে একটি করে হলের নাম যুক্ত করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাসিমুখে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর প্রথম মুখ মলিন হয় যখন সে বুঝতে পারে হলে তার থাকার মত কোন জায়গা নেই। বাইরে থাকার আর্থিক অবস্থা ও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বহু শিক্ষার্থীকেই নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিতে হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কাছে।

হল প্রশাসনের অভ্যন্তরে তাদের আছে আলাদা প্রশাসন ব্যবস্থা। সেই প্রশাসন ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, হল প্রশাসনকে চলতে হয় তাদের পরামর্শে। ফলে অন্যান্য বর্ষে যখন সিট ফাঁকা হয় তখন কোন রুমে কে উঠবে সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার থাকে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে। ছাত্রলীগের অধীনে হলে ওঠার পর  à¦¸à¦¾à¦§à¦¾à¦°à¦£à¦¤ একজন শিক্ষার্থীর ঠাঁই হয় গণরুমে। গণহারে যেসব রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয় সেসব রুমকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গণরুম হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে। বৈধ ভাবে চারজন থাকতে পারেন এমন এক একটি রুমের নামে যখন গণরুমের কলঙ্ক যুক্ত হয় তখন সেই রুমে বসবাস করে অন্তত ২৫-৩০ জন করে। কোন কোন গণরুমে রাতের বেলা এককাত হয়ে ঘুমাতে হয়, শিক্ষার্থীরা ঘুমানোর এই পদ্ধতিকে নাম দিয়েছেন ‘ইলিশ ফালি’।

নিয়তি মেনে নিয়ে অগত্যা গণরুমে যেসব শিক্ষার্থী থাকেন তাদের কাছে অপর আতঙ্কের নাম গেস্টরুম। বাংলায় অতিথি কক্ষ হলেও এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদমই অতিথিসুলভ আচরণ করা হয় না। বরং কংস মামার চরিত্রে হাজির হয় গেস্টরুমের আমন্ত্রণকারীরা। অনেক ক্ষেত্রেই, টর্চার সেলের বৈধ নাম ‌‌‌গেস্ট রুম। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ দুই নেতা- এই চার নেতার অনুসারীদের নিয়ে হলে হলে গড়ে ওঠে চারটি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপ পৃথকভাবে তার অনুসারীদের নিয়ে গেস্টরুমে বসে। প্রথম বর্ষকে দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষকে তৃতীয় বর্ষ এভাবে ধারাবাহিকভাবে জুনিয়রদের সিনিয়র নেতারা গেস্টরুমে ডেকে থাকেন।

গেস্টরুমে সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করলে এবং বড় ভাইকে সালাম দিতে ভুল করলে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বাবা-মা’র নামে গালি হজম করা হয়ে ওঠে অবধারিত। চড়-থাপ্পর ও ধাক্কা দিয়ে ফেলা দেয়া থেকে শুরু করে নানা সময় আসে নিষ্ঠুর নির্যাতনেরও খবর। গেস্টরুম প্রথার আজব-অদ্ভুত নিয়মের মধ্যে রয়েছে- কেউ কোন কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে না পারলে, কিংবা বাড়ি গেলে আগে থেকেই ছুটি নিতে হয় বড় ভাইদের কাছ থেকে।

তবে ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, ‘গেস্টরুমে তারা রাজনৈতিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেন’। তাদের এই দাবি পুরোপুরি অসত্য নয়। গেস্টরুমে পাঠচক্রসহ বেশ কিছু ইতিবাচক দিকও শেখানো হয়। ছাত্রলীগের অনেকেই বলে থাকেন, একজন কর্মীকে 'আদর্শ কর্মী' হিসেবে গড়ে তোলে 'গণরুম-গেস্টরুম'। শত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নিজেদের বাঁচতে শেখানো হয় এখানে। তবে তাদের এই যুক্তির পাল্টা যুক্তি দিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছেন, অক্সফোর্ডে-ক্যামব্রিজে এমন গণরুম-গেস্টরুম প্রথা নেই। সেখানকার শিক্ষার্থীরা কি বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না, রাজনীতি সচেতন হন না? তাহলে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে কেন এটি জরুরি?

বিভিন্ন হলের গণরুমগুলো ঘুরে সেখানে থাকা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণরুম ব্যবস্থা অমানবিক হলেও তারা স্বেচ্ছাতেই এখানে থাকছেন। কারণ বাইরে থাকার মত আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। তাই হঠাৎ করে গণরুম তুলে দিলে তা আরো বেশি অমানবিক হবে বলে উল্লেখ করেন তারা। নতুন ভবন তুলে সংকট নিরসনের পূর্বে তারা গণরুম ব্যবস্থা তুলে না দিয়ে তা ছাত্রলীগের পরিবর্তে হল প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার দাবি জানান।

অনুসন্ধানে যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে প্রায় শ খানেক গণরুম রয়েছে। এর মধ্যে মেয়েদের পাঁচ হলে হল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকা গণরুমে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে থাকতে পারছেন। আর যারা বৈধ গণরুমে সুযোগ না পেয়ে অকূল পাথারে পরেন তারা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত গণরুমে আশ্রয় নেন। বিনিময়ে তাদের রাজনৈতিক মিছিল মিটিং-এ নিয়মিত হাজির থাকতে হয়। আর ছেলেদের হলগুলোতে কোন বৈধ গণরুম নেই। শুধুমাত্র বিজয় একাত্তর হলে বৈধভাবে à¦¥à¦¾à¦•à¦¾à¦° সুযোগ পান অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী। তবে বেশির ভাগই সেই সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে নিজেকে গণরুমের গোলাম হিসেবে নাম লেখান। 

কোন কোন হলে আবার গণরুমও ভাগ্যে জোটে না ফলে বাধ্য হয়েই থাকতে হয় হলের বারান্দা, মসজিদ, গেমসরুম, টিভি রুম কিংবা ছাদে খোলা আকাশের নিচে। খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ ঝড়ো বৃষ্টিতে রাতে ঘুমের পরিবর্তে বৃষ্টির জলে নিজেদের চোখের নোনা জল আড়াল করতে হয় শিক্ষার্থীদের। মশার কামড়ে প্রায়ই ডেঙ্গু জ্বরে ভূগতে হয়  à¦à¦¸à¦¬ শিক্ষার্থীদের। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বারান্দায় থাকা শিক্ষার্থীরা এ জন্য বারান্দাকে নাম দিয়েছে ডেঙ্গু ব্লক।

গণরুম সংকট না কমলেও ডাকসু নির্বাচনের পর গেস্টরুম নির্যাতনের ঘটনা অনেকটাই কমেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ডাকসুর এজিএস ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রিত গণরুমগুলোতে সম্প্রতি গেস্টরুম প্রথা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে অনান্যগ্রুপগুলোতে গেস্ট রুম ব্যবস্থা বহাল তবিয়তেই চলছে।

গণরুম সংকট ও কেন গেস্টরুম নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে সাদ্দাম হোসেন বলেন, গণরুম বলতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর প্রতিটি রুমই গণরুম। কোনটা মিনি গণরুম, কোনটা বড় গণরুম। কারণ যেসব রুমে ১০ জন করে থাকে সেগুলোও তো গণরুমের মধ্যে পড়ে। কারণ ওই রুমে থাকার কথা চার জন কিন্তু সেখানে থাকতেছে ১০জন। 

আর গেস্টরুমের বিষয়ে তিনি বলেন, সেখানে কাউকে নির্যাতন করা হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী অপর একজন শিক্ষার্থীর গায়ে কেন হাত তুলবে? কারো গায়ে হাত তোলা ফৌজদারি অপরাধ। কারো বিরুদ্ধে যদি এমন কোন অভিযোগ ওঠে তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে, আমরা আমাদের সংগঠন থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিব।

এ বিষয়ে মতামত জানতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রাব্বানী বলেন, পূর্বে যাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়েছি। কোন শিক্ষার্থী হয়রানীর শিকার হলে আমার আহ্বান প্রক্টরিয়াল টিমকে জানান। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেব।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2024 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon