Bangla Runner

ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৩ | বাংলা

শিরোনাম

বিশ্বের বৃহত্তম সাত স্টেডিয়াম যুদ্ধ লাগলেই কেন বাড়ে স্বর্ণের দাম? তথ্যপঞ্জী লেখার নিয়ম বিতর্কের বিষয় ব্যাংক বিতর্কে শব্দ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে একজন ভাল লেখক হতে চাইলে এক নজরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক নজরে সুন্দরবন পরাগায়ন কাকে বলে? শৈবাল কী?
Home / ক্যাম্পাস

বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস আজ:

সেই ধসে যাওয়া জানালায় এখনো ভোর আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে

এম.এস.আই খান
শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ Print

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের প্রতীকি ছবি


‘‘ভিড় ঠেলে কোনো রকমে ঢুকলাম হলের ভেতরে। আহাজারি-রোনাজারি আর আর্তচিৎকার করছে প্রতিটি মানুষ। একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছে, তাপসকে দেখেছিস, কেউ বলছে প্রতাপকে দেখেছিস কেউ হয়তো কথার জবাব দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল দুর্ঘটনার পর ১৬ অক্টোবর ১৯৮৫ সংখ্যায় এভাবেই পরিস্থিতির বর্ণনা ছেপেছিল বাংলার বাণী পত্রিকা। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর দিনটি ছিল মঙ্গলবার। 

সেদিন বিটিভিতে নিজেদেরই এক সতীর্থ মনন অধিকারীর অভিনয় দেখতে ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবনে’ ভিড় করেছিল জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীরা। সে সময় এখনকারমত বেসরকারি টিভি চ্যানেল না থাকায় চিত্তবিনোদনের জন্য বিটিভিই ছিল এক মাত্র অবলম্বন। ফলে প্রতি মঙ্গলবারের মতো সেদিন রাত সাড়ে ৮টায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ শুরু হতেই একে একে চারশো দর্শক জমে গেল টিভি রুমে। বিটিভিতে যখন ‘শুকতারা’ আলো ছড়াচ্ছে তখন বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপজনিত কারণে রাজধানী ঢাকার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে শুরু হয় প্রচন্ড বৃষ্টিপাত। 

রাত পৌনে ৯টার দিকে দর্শকরা যখন বৃষ্টিস্নাত হিম হাওয়ার মধ্যে শুকতারা দেখতে বিভোর ঠিক সে সময় হঠাৎ করেই বিকট শব্দে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুর্হূর্তের মধ্যেই আর্তচিৎকার আর রোনাজারিতে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। সেদিন ভেতরে জায়গা না পেয়ে যারা দরজা বা জানালার ধারে বসে নাটক দেখছিল, তারা দৌড়ে বের হতে পারলেও অধিকাংশই নিজেদেরকে আবিষ্কার করেন ধ্বংসস্তূপের মাঝে। অন্ধকারের মধ্যে চাপা পড়া ছাত্রদের আর্তচিৎকারে জগন্নাথ হলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। 

টিপটিপ বৃষ্টি আর ঘন অন্ধকারের মধ্যে উদ্ধারকাজ ধীর গতিতে চলতে থাকে। ক্রেন, হেকসো ব্লেড ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রের অভাবে উদ্ধার কাজ চলতে থাকে মন্থর গতিতে। ফায়ার ব্রিগেড, রেডক্রস ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দলও সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। পরদিন ভোরের আলো ফুটলে উদ্ধার কাজে গতি আসলেও চাপা পড়া বহু ছাত্রের জীবনের আলো নিভে যায়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে হাজার হাজার ছাত্র এসে তখন সামিল হয়েছিল উদ্ধারকারীদের সঙ্গে। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ জনে থামে। আহত হয় শতাধিক। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়।

উদ্ধারকৃতদের এক হাসপাতালে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সিএমএইচ ছাড়াও ব্যক্তি-মালিকানাধীন বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।  à¦¹à¦¾à¦¸à¦ªà¦¾à¦¤à¦¾à¦²à§‡ ভর্তি করার পর আহতদের জন্য প্রচুর রক্তের প্রয়োজন পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ বহু সাধারণ মানুষ রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন। 

আগ্রহী রক্তদাতাদের এত ভিড় স্মরণকালে আর দেখা যায়নি। আহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে হাসপাতালে স্যালাইন ও জরুরি প্রাণরক্ষাকারী ওষুধের সংকট দেখা দেয়। স্যালাইন ও ওষুধের খোঁজে মানুষ ছুটে যায় বিভিন্ন ওষুধের দোকানে। দোকানীরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও স্যালাইন দিয়ে। তারপরেও সব জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

শহীদ মিনারের পাদদেশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় নিহতদের লাশ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মেধাবী শিক্ষার্থীদের লাশের সারি দেখে পুরো দেশ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। পরের দিন যাদের দুর্গাপূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। তারা চিরতরে চলে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে। চোখের জলে প্রিয় ছাত্রদের শেষ বিদায় জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির বর্ণনায় প্রত্যক্ষদর্শী বেগম মমতাজ হোসেন লিখেছেন- “জগন্নাথ হলের গেটের সামনে একজন মা, লাল টকটকে সিঁদুর সিঁথিতে, কপালে সিঁদুরের টিপ জ্বলজ্বল করছে। সাথে একজন প্রৌঢ় হয়তো কোনো বাবা হবেন। রিকশা থেকে নেমে দু’জন গেলেন সেই অডিটোরিয়ামের সামনে। দারোয়ান ধরা গলায় যখন বলল আর কি দেখবেন? সব শ্যাষ। মা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, তারপর অডিটোরিয়ামের রাস্তায় গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। ‘আহারে আমার পুত। আহারে আমার কেমনে মরছিল? আহারে দম বন্ধ হইয়া পুতে আমার না জানি কত কষ্ট পাইছে। মার বিলাপে ভিড় জমে গেল। বাবা যেন স্তব্ধ নির্বাক একটা পাথরের মূর্তি।” 

মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে তিন দিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। পরদিন ১৬ অক্টোবর সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর থেকে ১৫ অক্টোবর দিনটিকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। নিহতদের স্মরণে প্রতিবছর এ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, শোক র‌্যালি, স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, নীরবতা পালন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা অর্ধনমিত রাখাসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। 

এছাড়াও নিহতদের তৈলচিত্র ও তৎসম্পর্কিত দ্রব্যাদি প্রদর্শন, জগন্নাথ হলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা সভা, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসহ সকল হল মসজিদে মোনাজাত করা, রক্তদান কর্মসূচি, ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান, শোক সঙ্গীত ও কবিতা আবৃত্তিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’র প্রচার বন্ধ করে দেয়। নিহতদের স্মরণে ধসে পড়া অনুদ্বৈপায়ন ভবনের স্থলে নির্মাণ করা হয় ‘অক্টোবর স্মৃতিভবন’। 

তবে ধসে যাওয়া অনুদ্বৈপায়ন ভবনের ছিল এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই ভবনটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ ভবন বা সংসদ ভবন। ১৯৪৭ সাল থেকে এখানেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসত। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্ররা এই প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের উদ্দেশ্যেই মিছিল বের করেছিল। সেদিন পুলিশের গুলিতে পিচঢালা কালো পথ ছাত্রদের বুকের তাজা রক্তে লাল হয়েছিল। 

পরবর্তী সময়ে নতুন প্রাদেশিক ভবন নির্মাণের পর ১৯৬৩ সালে এই ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হস্তান্তর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছাত্রদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ হলের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে জগন্নাথ হলের এই ভবনটি আরো একবার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতার স্বাক্ষী হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একাত্তরের শহীদ আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নামে এই ভবনটির নামকরণ করা হয় ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবন’। 

ভবনটির করুণ পরিণতি সম্পর্কে বেগম মমতাজ হোসেন লিখেছেন, ‘‘একটার পর একটা নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল বহু বছরের এই ইমারতটি। প্রাণহীন নিরেট প্রাসাদটির দেহটিতে এ বেদনারই ঘুণ ধরেছিল বহু বছর আগে। অন্যায় অত্যচার অকালমৃত্যু, নির্মম হত্যা, অবহেলা এসব যেন সহ্য করতে পারলো না।’’

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ ভবনটির বয়স কেউ কেউ ১৫০ বছর বলে দাবি করেছেন। তবে জগন্নাথ হলের সাবেক প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক অজয় কুমার দাস এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জগন্নাথ হলের ধসে পড়া ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯২১ সালে। স্বাধীনতার পর তড়িঘড়ি করে কারিগরী দিক পর্যালোচনা না করেই ভবনটি চালু করা হয়। ১৯৮৫ সালে ভেঙ্গে পড়ার আগেই এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’ চুন, সুরকি আর লোহার রডের বিম দিয়ে তৈরি পুরনো জরাজীর্ণ এ ভবনটি ধ্বসে পড়ার পূর্বেই ‘কনডেমড’ বা বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। অথচ কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের বিনোদন ব্যবস্থা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ এই ভনটিতেই ১৯৭৯ সালে একটি বড় রঙিন টেলিভিশন সেট স্থাপন করে। 

জগন্নাথ হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ ড. রঙ্গলাল সেন লিখেছেন, ‘‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এক দশককাল যখনই যিনি হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন, তিনিই অ্যাসেম্বলি ভবনের ছাদ মেরামত করার জন্য বহু চিঠি লিখেছেন, যার সংখ্যা অর্ধশতাধিক হবে।’’ ড. রঙ্গলাল সেনের এ কথা থেকে বোঝা যায় ভবনটি ধসে পড়ার জন্য তৎকালীন প্রশাসনের অবহেলা ও উদাসীনতা দায়ী ছিল। তবে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পুরনো ও জীর্ণ ভবনটি ধসে পড়েছিল। 

এই মর্মান্তিক ঘটনার পরের দিন ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার প্রধান খবর ছিল- ‘‘কমপক্ষে ৪০০ আহত: তিন দিনের জাতীয় শোক: পতাকা অর্ধনমিত, জগন্নাথ হলে ছাদ ধসে ৩৫ জন ছাত্র নিহত’’। দৈনিক সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘‘জগন্নাথ হল মিলনায়তন ধসে ৫০ জন ছাত্র নিহত, আহত দুই শতাধিক। রক্তদানের আবেদন।’’ বাংলার বাণী ’র খবর ছিল- ‘‘জগন্নাথ হলের ছাদধসে ৫০ জন ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু আহত ৩ শতাধিক।’’ দেশের প্রায় সব পত্রিকারই প্রধান খবর ছিল জগন্নাথ হল দুর্ঘটনা নিয়ে। কোন কোন পত্রিকা এই দুর্ঘটনাকে ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবেও উল্লেখ করে। তবে তখনো নিহত, আহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত হতে না পারায় পত্রিকাগুলো ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ছাপে।

শিক্ষা: জগন্নাথ হল কালের স্বাক্ষী, ইতিহাসের স্বাক্ষী, আর স্বাক্ষী সন্তানহারা দীর্ঘনিঃশ্বাস ও চোখের জলের। জগন্নাথ হল দুর্ঘটনা এখনো দেশবাসীর কাছে ‘বুক ভেঙে যাওয়া হৃদয় চূর্ণ করা এক খবর’! দুঘটনার পর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। ‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কান্ডারী হুশিয়ার’ কবিতার এই আহবান সেদিন যেন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। 

অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ সেদিন হতাহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন সবাই এসেছিলো উদ্ধার কাজে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের চেতনা ছিল এক ও অভিন্ন। ঢাকা শহরের সকল প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নেমেছিলো। জগন্নাথ হলের অধিকাংশ ছাত্রই ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে গৃহশিক্ষকতা করতেন। দুর্ঘটনার পর তাদের ছাত্ররা প্রিয় স্যারের খোঁজে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।

করণীয়: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো গোলযোগে নয়। ভবন ধসে এ ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঢাকা শহরে তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন এ ধরণের আর কোন ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হতে না পারে, সে জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ ও পূর্বে নির্মিত ভবনগুলোর সক্ষমতা পরীক্ষা করা জরুরি। এখন থেকেই সম্ভাব্যতা যাচাই ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে ভবন নির্মাণ করতে হবে। 

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত খালি করার জন্য বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠনের নেতাদের এগিয়ে আসা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সেসব ভবনের সংস্কার কিংবা অপসারণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। এ ছাড়া রাতের বেলা অপ্রত্যাশিত কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে বৈদ্যুতিক আলোর অভাবে যাতে উদ্ধার কাজ ব্যহত না হয় সে জন্য এখন থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এ জন্য গাড়িতে শক্তিশালী জেনারেটর বসিয়ে সহজে ও দ্রুত স্থানান্তর যোগ্য সেবা চালু করা যেতে পারে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)’র তথ্য মতে, পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে কিংবা তারও আগে নির্মিত ভবনগুলো কোন স্থাপত্য পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করা হয়নি। কারণ প্রথম ডিআইটি (ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজউকের তথ্যানুয়াী পুরান ঢাকায় ৩২১টি ভবনকে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকেই রাজউক থেকে পরিকল্পনা অনুমোদনের পর সে অনুযায়ী ভবন তৈরি না করে নকশায় পরিবর্তন এনে সে ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। 

এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য খুব একটা দক্ষতা দেখাতে পারেনি রাজউক। নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।  à¦¢à¦¾à¦•à¦¾ বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব পুরানো ভবন জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে সেসব ভবন সম্পর্কে সতর্ক হওয়া উচিত। মুহসীন হল, সূর্যসেন হল, ফজলুল হক হল ও কার্জন হলের রুটিন মাফিক মান পরীক্ষা করার দিকে নজর দেওয়া উচিত। 

আর বর্তমানে ঢাকা শহরে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ভবন নির্মিত হচ্ছে, সেসব ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মান সম্পন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুকতারার মতোই সেই হতভাগ্য ছাত্ররা ত্যাগ ও গৌরবের আলোয় আলোকিত হবে সেদিন, যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো সংস্কার সাধিত হবে।

শেষ কথা: শরৎ আসে সারাদেশে কাশফুলের ঢেউয়ের দোলায় চেপে, ভোরের শিশিরে মুক্তোর হাসি ছড়িয়ে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জগন্নাথের আঙ্গিনায় শরৎ আসে মর্মান্তিকতার আঘাত হয়ে। বার বার চিঠি দেওয়ার পরেও যেখানে কোন ‘সংস্কার’ করা হয়নি, সেখানে একটি ‘নতুন ভবন’ নির্মিত হলো ৩৯টি তাজা প্রাণের বিনিময়ে। আর নতুন নির্মিত এই ভবনের মধ্য দিয়ে ভেঙ্গে পড়া সেই অডিটোরিয়ামটি যেন আবারো মুখরিত হয়ে উঠছে ছাত্রদের কোলাহলে। ইতিহাসের সেই মৃত্যুপুরী পরিষদ ভবনে তাই ফিরেছে প্রাণ চঞ্চলতা। সেই ধসে যাওয়া জানালায় এখন ভোর আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে। আর অন্ধকার কাটিয়ে প্রতিটি ভোরের সূর্য যেন বলে ওঠে, ‘মরণ সাগর পারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি’।

তথ্যসূত্র:

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডিঃ একটি ইতিহাস - বেগম মমতাজ হোসেন (মাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ৩য় সংখ্যা,অক্টোবর,১৯৮৫)।
 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস - সৌমিত্র শেখর (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৫ অক্টোবর ২০১৮)।
 জগন্নাথ হল দুর্ঘটনার ২৫ বছর- বিবিসি বাংলা রেডিওতে প্রচারিত আকবর হোসেনের প্রতিবেদন (১৫ অক্টোবর, ২০১০)।
 ফিরে দেখা জগন্নাথ হল ট্রাজেডি - সমির বিশ্বাস (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ অক্টোবর, ২০১৪)।
 ১৫ অক্টোবর:জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি - সুব্রত শুভ (মুক্তমনা ব্লগ, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬)।
 জগন্নাথ হল ট্রাজেডি: পেরিয়ে গেল ২৬ বছর- (বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ১৪ অক্টোবর ২০১১)।
 জগন্নাথ হলের যে স্মৃতি হবো না বিস্মৃত- মাহমুদা খাতুন মালা (রাইজিংবিডি ডট কম, ১৫ অক্টোবর ২০১৮)।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2021 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon