Bangla Runner

ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০২৪ | বাংলা

শিরোনাম

রম্য বিতর্ক: ‘কুরবানীতে ভাই আমি ছাড়া উপায় নাই!’ সনাতনী বিতর্কের নিয়মকানুন গ্রীষ্ম, বর্ষা না বসন্ত কোন ঋতু সেরা?  বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ই-মেইল বিশ্বের সবচেয়ে দামি ৫ মসলা Important Quotations from Different Disciplines স্যার এ এফ রহমান: এক মহান শিক্ষকের গল্প ছয় সন্তানকে উচ্চ শিক্ষত করে সফল জননী নাজমা খানম ‘সুলতানার স্বপ্ন’ সাহিত্যকর্মটি কি নারীবাদী রচনা? কম্পিউটারের কিছু শর্টকাট
Home / গল্প

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের গল্প

শ্রীপতি সামন্ত

বনফুল
বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৩ Print


ট্রেনে অসম্ভব ভিড়।
তিল ধারণের স্থান হয়তো আছে কিন্তু মনুষ্যধারণের সত্যই স্থানাভাব। তৃতীয় শ্রেণীতে লোক ঝুলিতেছে, মধ্যম শ্রেণীতে গাদাগাদি এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণীরও সমস্ত বার্থগুলি অধিকৃত। কেবল প্রথম শ্রেণীটি খালি বলা চলে। সেখানেও সাহেবি পোশাক পরিহিত একটি ভদ্রলোক বসিয়া আছেন।

একটি স্টেশনে গাড়ি থামিয়াছে।
রাত্রি আটটা হইবে।

শ্রীপতি সামন্ত সমস্ত প্ল্যাটফর্মময় ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইলেন, কোথাও উঠিতে পর্যন্ত পারিলেন না। অথচ তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যে ঘুমাইয়া যাইবেন। টিকিট তৃতীয় শ্রেণীর।

সকলে নেপোলিয়ন নহেন। সামন্ত মহাশয় ত নহেনই। সুতরাং তাঁহার দ্বারা এ অসম্ভব সম্ভব হইল না। বারকয়েক ছুটাছুটি করিয়া অদ্য এই ট্রেনযোগে তৃতীয় শ্রেণীতে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া কলিকাতা যাওয়ার আশা সামন্ত মহাশয়কে অবশেষে ছাড়িতে হইল।
কিন্তু অদ্য তাঁহার নিদ্রার নিতান্ত প্রয়োজন।

বিগত তিন রাত্রি মোটে ঘুম হয় নাই।
সর্বেশ্বরবাবুর নাতিনীটির বিবাহের গোলমালে দুই রাত্রি তিনি চোখের-পাতা এক করিতে পারেন নাই।
কাল ত অসহ্য গরম গিয়াছে।
লোকে পাখা নাড়িবে না ঘুমাইবে!
স্খলমান চশমাটা সামলাইয়া সামন্ত মহাশয় সহসা কুলিটাকে বলিলেন—ওরে দাঁড়া! শ্রীপতি সামন্ত নেপোলিয়ন নহেন, তাহা ঠিক —কিন্তু তিনি স্বর্গীয় ছিদাম সামন্তের কীর্তিমান পুত্র —যে ছিদাম সামন্তের প্রতিভার গুণগান এখনও ছেলে-বুড়ো সকলেই করিয়া থাকে।

শ্রীপতি সামন্ত থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন।
বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা বুদ্ধি মাথায় খেলিয়া গেল।
গার্ডের সহিত কথোপকথন-নিরত কাপড়-কোট-টুপি-পরিহিত ছোটবাবুর নিকট হাত কচলাইতে কচলাইতে সামন্ত মহাশয় বলিলেন —
‘‘টেরেনে ত আজ্ঞে চড়াই দায় হুজুর। যদি অনুমতি করেন, এই এক পাশটায় আমি চড়ে পড়ি —’’

বলিয়া সামন্ত মহাশয় প্রথম শ্রেণীর সংলগ্ন ভৃত্যের কামরাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন। ছোটবাবুটি এই নিতান্ত ভারতীয় বৃদ্ধের স্পর্যায় প্রথমটা হতভম্ব হইয়া পরে অনুকম্পান্বিত হইলেন। ভাবিলেন — মূর্খলোক হয়তো, বুঝিতে পারেন নাই —তাই।

বলিলেন —‘‘ওটা যে ফাস্টো কেলাস গো—’’

'ফাসটো কেলাস' চেনেন না এতটা মূর্খ অবশ্য সামন্ত মহাশয় নহেন। তিনি বিনীতভাবে আবার বলিলেন —‘‘আজ্ঞে ওটাতে নয়, এইটের কথা আমি বলছি। এটাতে ত গদিমদি কিছুই নাই। যদি হুজুর দয়া করেন —আমি বুড়া মানুষ—গরিব লোক —আমার শরীরটাও খারাপ—বিশ্বাস করুন হুজুর, তিন রাত্রি ঘুম হয় নাই’’ 
প্রথম শ্রেণীর যাত্রীটি জানালা দিয়া মুখ বাহির করিয়াছিলেন। তাঁহার মুখের এক প্রান্ত হইতে একটি ধূমায়মান পাইপ ঝুলিতেছিল। 
সামন্ত-ছোটবাবু-সংবাদ তিনি উপভোগ করিতেছিলেন। সামন্ত মহাশয়ের বাহ্যদৃশ্য অবশ্য মনোহর নহে।

পরনে একটি আধময়লা থান, খালি গা, পায়ে ধূলিধূসরিত একজোড়া দিশি মুচির তৈয়ারি চটি, চোখে তির্যকভাবে বসানো কাচফাটা চশমার ফ্রেম নিকেলের এবং তাহারও ডান দিকের ডাণ্ডাটা নাই, সেদিকে সুতা বাঁধা। সামন্ত মহাশয়ের ঘাড়টি ঈষৎ বাঁকা, চক্ষু দুইটি রক্তাভ —চোখের পাতা নাই। চোখ দুইটি দেখিলে কিন্তু লোকটির প্রতি শ্রদ্ধা হয়। লোলচর্ম নির্লোম মুখখানি বিনয় গদগদ। মাথায় টাক। বর্ণ নাতিফরসা-কালো। হাতে থেলো হুঁকা।

ছোটবাবু বলিলেন — ‘‘এই সায়েবকে বল। ওঁরই চাকরের জন্য ও কামরাটা আলাদা করা আছে। উনি যদি আপত্তি না করেন, আমার আর আপত্তি কি —’’

প্রথম শ্রেণীর যাত্রীটি সাহেবি পোশাক পরিহিত হইলেও বাঙালী। কিন্তু মাথা নাড়িয়া পাইপ চিবাইয়া তিনি উত্তর দিলেন —

‘‘দ্যাট কান্ট বি। আই কান্ট এলাউ।" সামন্ত মহাশয় করজোড়ে বলিলেন-"আমিও ত হুজুরের চাকরই-চাকর ছাড়া আর কি। অনুমতি যদি করেন দয়া করে—’’

এই বৃদ্ধের সহিত বাগবিতণ্ডা করিয়া সময় নষ্ট করিতে সাহেবের আর প্রবৃত্তি হইল না। তিনি স-পাইপ মুণ্ড ভিতরে টানিয়া লইয়া ইলেকট্রিক পাখাটা ফুল ফোর্সে খুলিয়া দিলেন।

ঢং ঢং করিয়া গাড়ি ছাড়িবার প্রথম ঘণ্টা হইল। 
সামন্ত মহাশয় অসহায়ভাবে আর একবার তৃতীয় শ্রেণীগুলির দিকে চাহিলেন।
পায়দনে পর্যন্ত লোক ঝুলিতেছে।
উহারই মধ্যে শেষে ঢুকিতে হইবে! অথচ—
সামন্ত মতি-স্থির করিয়া ফেলিলেন!

‘‘শুনলেন হুজুর—এইটাতেই চড়লাম আমি, কুরুকে পাঠিয়ে দেন—ভাড়াটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। ওরে, আন আন এইটাতেই আন সব —ওহে কালীকিঙ্কর —শ্যামাপদ কোথায়—বাঞ্ছা —ও বাঞ্ছা, —এই দিকে —এইখানেই চড়াও সব —’’

হৈ হৈ শব্দে কালীকিঙ্কর, শ্যামাপদ, বাঞ্ছা, কয়েক বোঝা শালপাতা, এক বাণ্ডিল খালি বস্তা, দুই হাঁড়ি গুড়, একটা তরমুজ, একটা বঁটি, একটা ছিপ, দুইটা প্রকাণ্ড ঝুড়িতে নানাবিধ ছোট বড় বোঁচকা ও পুঁটুলি ও এক টিন ঘি সমেত সামন্ত মহাশয়কে ফার্স্ট ক্লাসেই তুলিয়া দিল। কালীকিঙ্কর ও শ্যামাপদ পদধূলি লইয়া নামিয়া গেল।

সামন্ত মহাশয় হাসিয়া বাঞ্ছাকে বলিলেন —‘‘তুই তা হলে ওই পাশের কামরাটায় থাক গিয়ে। তোরই মজা হল রে। তামাক টিকে সব গুছিয়ে রাখ—’’
বাঞ্ছা নামিয়া পাশের কামরায় চড়িল।
ট্রেন ছাড়িয়া দিল।

থেলো হুঁকাটায় একটা টান দিয়া ঘড়ঘড়ায়মান কফটাকে সশব্দে বাহিরে নিক্ষেপ করিয়া সামন্ত মহাশয় সাহেবকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন—
‘‘ঘুমটা হওয়া আজ নিতান্ত প্রয়োজন, হুজুর!—কাল সকালে মাথাটা ঠিক রাখা দরকার —অনেক টাকার কেনা-বেচা করতে হবে—’’

যথাসময়ে গুম্ফশ্মশ্রু-সমন্বিত পাঞ্জাবি ক্রু আসিয়া দর্শন দিলেন ও ভাড়া চাহিলেন।
সামন্ত মহাশয় বেঞ্চির উপর উবু হইয়া ক্রুর দিকে ঈষৎ পিছু ফিরিয়া বসিয়া কোমর হইতে এক সুদীর্ঘ গেঁজে বাহির করিয়া বেঞ্চির উপর সেটি উজাড় করিয়া ঢালিলেন এবং ক্রুর নির্দেশমতো নিজের যাবতীয় জিনিসপত্রের ভাড়া চুকাইয়া দিয়া স-রসিদ গেজেটি পুনরায় কটিবন্ধ করিলেন।

যদি কেহ গনিয়া দেখিত, দেখিতে পাইত, সামন্ত মহাশয়ের গেজেতে খুচরা টাকা ছাড়া দশ হাজার টাকার নোটই রহিয়াছে।
তাহার পর পাঞ্জাবি ক্রু বাঙালী সাহেবটির দিকে ফিরিয়া বলিলেন —‘‘ইওর টিকেট প্লিজ।’’
‘‘মাই টিকেট ইজ ইন্‌ মাই সুটকেস্। প্লিজ টেক্ মাই ওয়ার্ড ফর ইট্।’’

‘‘আই কান্ট পাঞ্চ ইওর ওয়ার্ড। মাই ডিউটি ইজ টু পাঞ্চ টিকেটস্—’’

অবশেষে দেখা গেল বাঙালী সাহেবটির নিকট দিয়াশলাই, পাইপটি ও একটি সিনেমা-সাপ্তাহিক ছাড়া আর কিছুই নাই।
বচসা বাধিল।

বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বেশিক্ষণ বচসা চালানো শক্ত।
সুতরাং উভয়েই রাষ্ট্রভাষা হিন্দীর শরণাপন্ন হইলেন।
সামন্ত মহাশয়ের একটু তন্দ্রা আসিয়াছিল—ভাঙিয়া গেল। তিনি উঠিয়া বসিলেন।
ভগবান বিরূপ হইলে কার বাবার সাধ্য ঘুমায়!

দুর্গা-শ্রীহরি!-
সামন্ত মহাশয় সশব্দে বিজৃম্ভণ করিলেন।
সহসা সামন্ত মহাশয়ের কানে গেল ‘কুরু’ যেন সাহেবটিকে বলিতেছে, যে, বাঙালী বাবুদের সে ভালো করিয়াই চেনে, সুতরাং—
সামন্ত মহাশয়ের চুল-হীন ভ্রযুগল কুঞ্চিত হইল।

তিনি আবার উবু হইয়া বসিয়া কোমর হইতে গেঁজে বাহির করিলেন।
‘‘ও কুরু মশায়—বাজে কথার কচকচিতে আর কাজ কি। কটা টাকা লাগবে বুলন—আমি দিয়ে দি—ঘুমটা আমার হওয়া আজ নিতান্তই দরকার—যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপান্ন’’—
সাহেব ও ক্রু উভয়েই বিস্মিত হইলেন। বলে কি!

সামন্ত মহাশয় কিন্তু সমস্ত ভাড়াটা মিটাইয়া দিলেন এবং সাহেবকে বলিলেন—
‘‘আপনিও ত হুজুর কোলকাতা যাচ্ছেন। আমার গদিতে টাকাটা জমা দেবেন সুবিধামতো—’’
এই বলিয়া তিনি একটা ঠিকানা দিলেন।

তামার পর ক্রুর দিকে ফিরিয়া মাথা ঝাঁকিয়া সামন্ত মহাশয় রাষ্ট্রভাষায় বলিলেন— ‘‘কটা বাঙালী আপ দ্যাখা হ্যায়? জাত তুলকে গালাগালি দেওয়া কোন দিশি ভদ্রতা রে বাপু! দুর্গা শ্রীহরি, দুর্গা শ্রীহরি, দুর্গা শ্রীহরি’’—

সামন্ত মহাশয় আবার বেঞ্চে লম্বমান হইলেন।
বাঙালী সাহেবটি সামন্ত মহাশয়ের গদিতে টাকাটা ফেরত দিয়াছিলেন কি না জানি না-কিন্তু সমস্ত পথটা তিনি আর পাইপ ধরাইতে সাহস করিলেন না।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2024 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon