শিরোনামসাত কলেজ সংকট
অধিভুক্ত সাত কলেজ বাতিলের আন্দোলন একটা সস্তা জনপ্রিয় আন্দোলন যেটার নৈতিক ভিত্তি খুব দুর্বল। প্রথম-দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের 'তীব্র ঢাবিয়ান অনুভূতি' কাজে লাগিয়ে নিজে 'নেতা হওয়ার বাসনা' থেকে অনেকেই শিক্ষার্থীদের আবেগের সাথে আরও মাল-মশলা মিশিয়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাত কলেজের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কচ্ছপের গতির মতো শ্লথ হয়ে গেছে বলে যেসব দাবি উঠছে সেগুলা ভূয়া কথা।
রেজিস্ট্রার বিল্ডিং এ সাত কলেজের জন্য আলাদা সেকশন আছে, যারা শুধু ওইসব কলেজের প্রশাসনিক কাজগুলাই করেন। এইটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন। এখানে কাজের গতি শ্লথ, কারণ যুগ যুগ ধরে দায়িত্বে ফাঁকি দিতে দিতে ফাঁকি দেয়ার সেই পুরনো অভ্যাস অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়ে গেছে। তবে সাত কলেজ অধিভুক্ত করার পর থেকে সার্বিক কাজের যে সমন্বয় হচ্ছে না সেটা অস্বীকার করার উপায়ও নেই। সেকারণে সমস্যা হয় কিছু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং এর কাজের গতি নিয়ে ফেসবুকে ট্রল করা বা ক্ষোভ ঝাড়লেও আন্দোলন করে রাজপথ কখনো গরম করেনি।
এই প্রথম তারা রাজপথ গরম করছে, কারণ এখানে সাত কলেজ বাতিলের একটা এক্সকিউজ আছে। সাত কলেজ বাতিলের কথা উঠলে আগে যারা টিপ্পনী কাটতেন, এখন তাদের কেউ কেউ এই জনপ্রিয় আন্দোলনে ছাতা ধরেছেন। কারণ ডাকসুর ভোট একটা ফ্যাক্টর। জনপ্রিয় আন্দোলনের পক্ষে স্ট্যান্টবাজি না করলে পরেরবার ভোট পাবেন না। পাবলিক সিম্প্যাথি পেতে বা জনপ্রিয় হতে গিয়ে এদেশে নাস্তিকের হজ্বে যাওয়ার ইতিহাসও বেশ পুরনো নয়। আন্দোলনের মূল স্ট্যান্ডপয়েন্ট নিয়েই আমার আপত্তি, তাই এতো কথা। আন্দোলনে যুক্তি হিসেবে যতো দাবিই উপস্থাপন করা হোক, এর মূল কারণটা হচ্ছে সাত কলেজের বহু শিক্ষার্থী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে নিজেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়।
সেটা টিউশনির বাসায় দিক, নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দিক, কোন ভালো কাজ করতে গিয়ে দিক কিংবা কোন অপরাধ করতে গিয়ে দিক, যেভাবেই দিক, এই সামগ্রিক বিষয়টাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেগী ছেলে-মেয়েরা মেনে নিতে পারছে না। এইটা মূল কারণ। গত দু'দিনের আন্দোলনে যেভাবে সাত কলজের লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আত্ম-অহমিকার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা চরম শ্রেণী বিদ্ধেষমূলক। এই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর শিক্ষার্থী আছে, যাদের এমন একটা ভাব যে ওইসব কলেজে পড়া শিক্ষার্থীরা মানুষই না। এক ঘন্টার একটা ভর্তি পরীক্ষায় আমরা সবাই অংশ নিয়েছি।
আমরা ভর্তির সুযোগ পেয়েছি বলে আমরাই কেবল মেধাবী, ওরা মেধাবী না এরকম ধারণা লালনকারীরা নিজেদের অহংকারে একদিন ধ্বসে পড়বে। একাডেমিক লাইফজুড়ে আমার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করা বহু বন্ধু-বান্ধব ভর্তি পরীক্ষার ওই সময়টা ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারে নাই বলে ওরা এখন বেসরকারিতে বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার অর্থ এই না যে, ওরা কম মেধাবী। ওরা ওদের কাজের জায়গায় আমার চেয়ে বহুগুণে দক্ষ। বহু সীমাবদ্ধতার থাকার পরেও আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারা এই দেশের স্টুডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিভিলেজড ক্লাস। সাত কলেজের ওরা বঞ্চিত। ওদের অবস্থা এমন যে ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাকি কলেজের ছাত্র, এই পরিচয়হীনতায় ভোগে।
ওদের সেশান জট ছিলো না, অধিভুক্তির পর সেটা বেড়েছে কয়েকবছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সিলেবাসের সাথে সমন্বয় করে কলেজগুলোতে পড়াশোনা না হওয়ায় ওদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করছে।একটা ডিগ্রির পেছনে জীবনের কতোগুলো মূল্যবান বছর ওরা নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছে। বঞ্চিত তো ওরা। বঞ্চনা থেকে ওদের অভিমান থাকতে পারে, রাগ থাকতে পারে এবং সেই রাগের যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তাই তারা আন্দোলন করেছে। কিন্তু ঢাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এসেন্স দেখে এটাকে সমাজের উঁচু শ্রেণীর সুবিধাভোগীদের আন্দোলন মনে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুগে যুগে কালে কালে নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছে, আন্দোলন করেছে। আপনারা চাইলে পারতেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। প্রশাসনকে বলতেন এই সংকটের সমাধান করতে। সাত কলেজের কাজকর্মের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি করতে; না পারলে অধিভুক্তি বাতিল করতে। তারাও কিন্তু অধিভুক্তি বাতিল চায়। আপনারাও চান। অথচ আপনারা দুই পক্ষই এখন হেইট-স্পিচ ছড়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আন্দোলনকারীর বক্তব্যের জন্য ওই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরাও এখন গালাগালি, মারামারি হুমকি দিচ্ছেন। একটা বাজে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সাত কলেজের অধিভুক্তির পর সার্বিকভাবে ঢাবির শিক্ষার্থীদের কিছু সমস্যা যে হচ্ছে না সেটা বলার সুযোগ নেই। তবে আপনারা যে লবিংয়ে নিয়োগ পাওয়া মাস্টারদের ক্লাস করে কিচ্ছু বোঝেন না, লেখাপড়ার মান যে তলানিতে পড়ে যাচ্ছে, আরও হাজারটা সমস্যা যে আছে সেগুলা যদি মেনে নিতে পারেন তাহলে এই সমস্যাটা মেনে নিতেও আপনারা পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। তবুও চাই সব সংকটের অবসান হোক। মূল কথা আন্দোলন করবেন করেন, ঘৃণা ছড়াবেন না ভাই। এটা খুব খারাপ জিনিস। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবস্থা, এরমধ্যে অন্য জায়গায় পড়ালেখা করা মানুষরে এইভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে দুইদিন পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র পরিচয় দিলে বাইরের মানুষ গুনবেও না।
আমরা চাই শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতি। অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তারা একে অন্যের পাশে থাকবে। জমি-জমা নিয়ে বিরোধ থেকে গ্রামে যেমন দুই পক্ষ লাঠিসোটা নিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয় তেমনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যদি এমন বিরোধ বাধায় তাহলে সেটা আমাদের জাতীয় স্বার্থের ওপর বড় আঘাত ফেলবে। এমনিতেই ধর্ষণ, গুজব, গণপিটুনি, সাম্প্রদায়িকতার মতো বিশ্রী বিশ্রী বিষয়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশটা বড় অস্থির সময় পার করছে। এসময় দেশের টপক্লাস স্টুডেন্টরা দুভাগে ভাগ হয়ে এমন বিদ্বেষ ছড়ালে দেশটা ভরসা করবে কাদের ওপর?
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[প্রিয় পাঠক, মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে বাংলা রানার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। মুক্তমত কিংবা বাংলা রানারে প্রকাশিত কোন মতামতের প্রতিক্রিয়া পাঠাতে পারেন brtube717@gmail.com এই ঠিকানায়]
আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????
??????? ?????? ??? ??? ???
???????????? ?????????????? ??????? ?? ???? ???? ???!
???? ????? ???? ???? ??????? ???? ??? ??????????
???? ??? ???? ?????? ????? ??? ??? ?????? ??????? ???????
??????? ?????????
?????????? ?? ?????
??????? ?????????????? ?????? ???????????? ?????????? ??????? ?????????????
?????? ???????? ???? ??????
???????? ??? ?????, ????????? ????????? ???? ??? ?????
?????? ????? ?????? ???? ???? ?????