Bangla Runner

ঢাকা , রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | বাংলা

শিরোনাম

ট্যাক্শের গান গাই নজরুলের দর্শন ও চেতনা সব শ্রেণির মানুষকে অনুপ্রাণিত করে ঢাবিতে আগামীকাল পালিত হবে জাতীয় কবির ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী একুশে ডিবেটিং ক্লাবের নেতৃত্বে সাফিন ও আলিফ মুজিব মুজিব ডাক উঠেছে ঢাবিতে স্নাতক ১ম বর্ষের ক্লাস শুরু ৭ সেপ্টেম্বর ঢাবির জসীমউদ্দীন হল ডিবেটিং ক্লাবের নতুন কমিটি ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ ঢাবিতে বঙ্গমাতা’র উপর আন্তর্জাতিক সম্মেলন উদ্বোধন আগামী ৭ আগস্ট যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ঢাবি শিক্ষার্থী বহিস্কার
Home / বই আলোচনা

স্পাই: রহস্যে ঘেরা, বাঙালি তরুণের সাহসের গল্প

এম.এস.আই খান
রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০২২ Print


পুরো আট ঘণ্টার দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ। অথচ এত তাড়াতাড়ি ল্যান্ড করার কথা নয় ওদের বহনকারী অত্যাধুনিক উড়োযান বোয়িং ৭৮৭ এর। জাপান সাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় হকচকিয়ে যায় রনি ও সজীব। এমন অসময়ে উড়ালযানের জমিনে নেমে পানি খাবার কোন কারণ নেই। আসে সুনামির কথা, কি ঘটতে যাচ্ছে বিমানের ৪৫০ যাত্রীদের ভাগ্যে?

এমন ভয়ার্ত ও উদ্বেগপূর্ণ ঘটনার দমকা হাওয়া দিয়ে শুরু হয় কিশোর অ্যাডভেঞ্চারধর্মী বই স্পাই (ISBN: 978-984-92955-7-0)। লেখক অরুন কুমার বিশ্বাস প্রায় মারতে মারতে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে বাঁচিয়ে রাখেন চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনসের যাত্রীদের। তবে বিমানটির ঠিক কি হয়েছিল, যে কারণে জরুরী ল্যান্ড করতে হল জাপানের কানসাই এয়ারপোর্টে। কোন সন্ত্রাসী হামলা নাকি চোরাকারবারীদের কোন হাত ছিল নাকি নিছকই যান্ত্রিক ত্রুটি?

উত্তর দেয়ার আগে জানিয়ে রাখি ১২৮ পৃষ্ঠার এই রহস্যঘেরা বইটির মুদ্রিত মূল্য ২৩০ টাকা। তবে পাঠকরা ২০-২৫% ছাড়ে বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিঃ থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি। হার্ডকভারের এই বইটির প্রচ্ছদ যে কারো মনে ধরবে। প্রচ্ছদ দেখেই মাথায় রহস্য ভর করবে, তিন তরুণ আর এক তরুণীর দিকে তাকিয়ে কি দেখছে কালো ছায়ার বৃহৎ চোয়ালের ওই অবয়বটি?

লাতিন আমেরিকার একটি এনজিওর স্পন্সরে চেঙ্গিজ খানের দেশ মঙ্গোলিয়ার আলতাই পাহাড় দেখতে যাচ্ছিল সজিব ও রনি। ল্যান্ড অব ব্লু স্কাই খ্যাত উলানবাটোরের (প্রগাঢ়) নীলাকাশের সৌন্দর্য দেখতে যেয়ে যে, জাপানে পনপন করে ঘুরতে হবে তা কে জানত আগে? যাহোক সজীব-রনি এক রাতের জন্য জাপানের পঞ্চান্ন তলা রয়াল রিগা হোটেলে ঠাঁই পেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে। সেই সঙ্গে হোটেলে ওদের দুজনের কাণ্ড দেখে পাঠকও দীর্ঘশ্বাসের কালো রেখা সরিয়ে কিছুটা হাসির খোড়াক পায়। টয়লেটে যেয়ে ভুল বাটন প্রেস করে পশ্চাৎদেশ ধোয়ার বদলে ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ভিজিয়ে বের হয় সজিব। শীতে সজীব কাঁপতে থাকলেও এই কাঁপুনি রনিসহ উভয়কে কাপতে হয় যখন তারা বুঝলো তাদের সঙ্গে অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। 

হোটেলে রাত্রীযাপন করা বিমানের সব যাত্রী এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বড় দুটি বাসে উঠে পড়ল এবং সজীব-রনিদের তোলা হল আলাদা সুবারুতে। কিছু সময় পার হতেই তাদের হৃৎপিন্ড লাফাতে শুরু করলো। কেননা সুবারুর পিছন সিটে বসা উলের কানটুপি পরিহিত এক ব্যক্তি ঠোঁটে পিস্তল ছুঁইয়ে বলল, ‘চুপ’। প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে যখন সুবারু থামলো তখন সজীব-রনি বুঝলো- প্রথম বিপদ ছিল বিমানে, দ্বিতীয়টা স্থলে। জাপানে কানটুপি পড়া এক ব্যাক্তির হাতে তারা কিডন্যাপ হয়েছে। 

কানটুপি পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের উঠিয়ে দেয় হোটেল ‘হোতেরো কিরি’তে। হোটেলে উঠে সজীব-রনির পরিচয় হয় জাপানী মেয়ে তুসকানা রুশি বারজিয়ার সঙ্গে। বড় নামকে ছোট করতে বাঙালি সিদ্ধহস্ত। গোলগাল মায়াবী মুখের জাপানী মেয়েটি নাম দিয়ে দিল ‘তুবা’! হোটেলে থাকতে যেয়ে একপর্যায়ে তুবার সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে সজীবের।
একদিকে তুবার প্রতি আকর্ষণ অন্যদিকে খুনে চোখের বদরাগী লোকটার শেষমুহূর্তের কথাগুলো মনে পড়তেই রক্ত হিম শীতল হয়ে যায় সজীবের। হোটেলে ছাড়ার আগে কানটুপি তাদের একটা কৌটা দিয়ে সাবধান করে দিয়েছিল, ‘ভুলেও খুলো না। কক্ষনো না,  ওটা তোমাদের প্রাণভোমরা।’ কি আছে ওই কৌটায়? ওটা কি যে কোন সময় বিস্ফোরিত হয়ে পুরো হোটেলসহ সজীবদের শেষ করে দিবে?

ভ্রমণপ্রিয় লেখক অরুণ কুমারের এই উপন্যাসটি পড়তে যেয়ে পাঠক পরিচিত হবে জাপানের লেন, অলি-গলি, স্টেশন, হোটেলের সাথে। জানবে যীশু খৃষ্টের জন্মের ৬৬০ বছর আগে চালু হওয়া সিনটো ধর্মকে এখনো জাপানের ৮০ ভাগ মানুষ কতটা শ্রদ্ধার সাথে ধারণ করে আছে। সজীব-রনির মত তুবার মুখে পাঠক জাপানি রেসলিং ও রিকিশিদের জীবনাচার শুনে বিস্মিত হবে। পাঠক কখনো হাসবে, কখনো কৌতূহলী হবে, কখনো এডভেঞ্চার প্রিয় সজীব-রনির সাথে ভয়ে চুপসে যাবে। জাপানের সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট ফুজি দেখতে যেয়ে তারা গড়ায়, হাঁপায়, জিরোয়!
আতংক আর জিম্মিদশা কাটিয়ে কি করে তারা জাপানের প্রদেশ থেকে প্রদেশে ঘুরে বেড়ায়? কিভাবেই বা জাপানে ষোল শতকের আজুচি-মোমোআমা শাসনামলে নির্মিত সুরম্য স্থাপত্য ‌‌‌‘ওসাকা কাসল’ দেখতে যায়? 

স্নায়ু চাপ উপেক্ষা করে পাঠক হাসবে যখন ‘আরিগাতো গজাইমাছ’ (অনেক ধন্যবাদ) শুনে সজীব বোকার মত বলে বসবে, ‘কী মাছ বললে? গজার মাছ?’ জাপানী ভাষা বুঝতে না পেরে এমন বেশ কয়েকটি চরম হাস্যকর ঘটনা পড়ে যে কেউ হার্ট ভাল রাখার খোড়াক পাবেন। বেশ কিছু মজার মজার জাপানি শব্দও রপ্ত হয়ে যাবে আনমনে। যেমন- ইরাশাতি কুদাছাই (সু স্বাগতম), মান সাকাতা সালিম ( বোবার কোন শত্রু নেই), কেইদাতু (পুলিশ), কোবান (পুলিশ স্টেশন) প্রভৃতি।

রহস্যে ঘেরা প্রাণভোমরার কৌটা কানটুপির নির্দেশ অনুযায়ী দূরের একটি লকারে রাখতে যেয়ে তারা পেয়ে যায় মহামূল্যবান প্লাটিনাম। এটি নিয়ে শুরু হয় নতুন নাটকীয়তা। এরই মধ্যে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাঠানো টেক্সট থেকে সজীব-রনিরা জানতে পারে কানটুপির নাম নিমকু। তবে এটি যে ছদ্মনাম তা বুঝতে বাকি থাকে না কারো।

উপন্যাসের শেষ দিকে উপগ্রহ থেকে পাঠানো নির্দেশ অনুযায়ী দুই বন্ধু পিস মেমোরিয়াল পার্কে যেয়ে ৭ নং কর্পূর গাছ খুঁজতে থাকেন। এখানে যেয়ে তারা অবিষ্কার করে হোটেলের কক্ষ থেকে শুরু করে কৌটা রাখার লকার এমনকি গাছের নাম্বারেও ৭ সংখ্যা। এই সংখ্যাটি দিয়ে কি বোঝায় সে রহস্য নিয়েই উপন্যাস এগিয়ে যায় শেষের দিকে। ভাগ্যক্রমে কোলকাতার ছেলে আকাশকে পেয়ে রনীরা যেন এক বুক সাহস সঞ্চার করে। সজিবের দাদু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এই তথ্য জানিয়ে বাঙালিকে কিছুটা শেকড়ের স্মৃতিও দিতে চেয়েছেন লেখক।

নিমকু ও তার সাগরেদদের ভয়ে বুকের মধ্যে উথাল পাতাল চলা কালে যে প্রশ্নটি শুরু থেকেই মনে জাগবে সেটি হল তারা কেন পুলিশকে জানায়নি? পুলিশকে না জানানোর পিছনে কি তাদের কোন বিশেষ স্বার্থ ছিল? নাকি অন্যকোন অদৃশ্য বারণ? তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে খবর পৌঁছে, নিপ্পন টিভির বদৌলতে ঘটনা জানতে পারে গোটা জাপান জাতি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে দেন নিমকুকে ধরতে না পারলে পদত্যাগ করবেন।

কিন্তু ধূর্ত নিমকু সেই ঘোষণা জানা মাত্রই বেশ-ভূষা বদল করে উঠে যায় বিমানে। অন্যদিকে নিমকুর অবৈধ মালামাল থেকে যায় সজীব-রনিদের হাতে। নিমকুকে জাপানে পাওয়া না গেলে চোরাকারবারি হিসেবে জেলে পচতে হবে আজীবন। এই ভয়ে রনির হাত পা ঘামে, আকাশ ভাবতে থাকে। মুক্তি মিলবে কি? মঙ্গোলিয়ার আকাশ-পাহাড় দেখার সুযোগ শেষ পর্যন্ত হবে কি? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে স্পাই! তবে তুবার সাথে কি হল? প্রেম নাকি বিয়ে? সেই প্রশ্ন জাগতেই শেষ হবে স্পাই।

সমালোচনা: উন্নতমানের কাগজ, ঝকঝকে ছাপা আর ভালো বাঁধাই পাঠককে এক ফুরফুরে মেজাজ দিবে। তবে বেশ কিছু ত্রুটি বইটির চাঁদের কলঙ্ক হয়ে পাঠকদের আহত করবে। যেমন: সজিব-রনির যাওয়ার কথা মঙ্গোলিয়া। যেখানে তাদের জাপান নামারই কোন কথা ছিল না সেখানে তারা ‘এক মাসে জাপানী শেখার বই’ কোথায় পেল? বিষয়টি পরিষ্কার নয়। এর বাইরে কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে যেমন- ৩১ পৃষ্ঠার প্রথম লাইনে ‘জুসের জগ’ -এর পরিবর্তে ‘জুসের জাগ’ ছাপা হয়েছে। ৫২ পৃষ্ঠায় দ্বিতীয় প্যারার শেষ লাইনে ‘ফেরিঘাটের’ স্থলে ‘ফের ঘাটের’ ছাপা হয়েছে। ১০১ পৃষ্ঠায় ‘খেলে’ লেখার পরিবর্তে ‘থেলে’ রয়েছে। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে এ বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেবেন।

এর বাইরে লেখক উপন্যাসে চরিত্র বর্ণনায় তার বেশ কিছু দর্শন দিয়েছেন। যেমন- জীবনে জোশ না থাকলে বেঁচে কী লাভ? কিংবা জীবনের জন্য কাজ, কাজের জন্য জীবন নয়। লিখেছেন- যার যত ক্ষমতা, সে-ই তত বড় জুলুমবাজ। দুর্নীতিবাজ পুলিশ সম্পর্কে বলেছেন- সব দেশেই পুলিশের চরিত্র মোটামুটি এক।

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2021 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon