Bangla Runner

ঢাকা , বুধবার, ২২ মে, ২০২৪ | বাংলা

শিরোনাম

সনাতনী বিতর্কের নিয়মকানুন গ্রীষ্ম, বর্ষা না বসন্ত কোন ঋতু সেরা?  বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ই-মেইল বিশ্বের সবচেয়ে দামি ৫ মসলা Important Quotations from Different Disciplines স্যার এ এফ রহমান: এক মহান শিক্ষকের গল্প ছয় সন্তানকে উচ্চ শিক্ষত করে সফল জননী নাজমা খানম ‘সুলতানার স্বপ্ন’ সাহিত্যকর্মটি কি নারীবাদী রচনা? কম্পিউটারের কিছু শর্টকাট ভালো চাইলে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করুন
Home / প্রবন্ধ

‘সুলতানার স্বপ্ন’ সাহিত্যকর্মটি কি নারীবাদী রচনা?

এম.এস.আই খান
শনিবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ Print


 

নারীবাদ কী এবং নারীবাদী কারা:
উত্তরে যাবার আগে আমাদের জানা দরকার ‘নারীবাদ’ আসলে কী? নারীবাদ বা Feminism শব্দটি ফরাসি ‘Feminine’ থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘নারী’। এই শব্দটির সঙ্গে ‘Ism’ বা ‘বাদ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে Feminism-এ পরিণত হয়। বৈশ্বিক আন্দোলন হিসেবে ১৮৮০ সালে ফ্রান্সে, ১৮৯০ সালে যুক্তরাজ্যে এবং ১৯১০ সালে যুক্তরাষ্টে নারীবাদ শব্দটির প্রচলন হয়।[১] নারীবাদ বিষয়ে জুডিথ অ্যাস্টেলারা তাঁর ‘Feminism and Democratic Transition in Spain’ বইতে বলেন, “নারীবাদ হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা, যা নারী নিপীড়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে চেষ্টা করে থাকে।[২]

বাংলাপিডিয়ার অনুসারে, “নারীবাদ হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার একটি মতবাদ, যাতে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বিস্তার রোধে নারীদের সংগঠিত হওয়ার উপর এবং সামাজিক জীব হিসেবে সমঅধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের জন্য সমাজকে নিরাপদ আবাসস্থলে রূপান্তরিত করার উপর গুরুত্ব দেয়।”

আর নারীর এসব অধিকার নিয়ে যিনি বা যারা কথা বলেন তিনি বা তারা নারীবাদী।  অন্যভাবে বললে, নারীবাদী ওইসব নারী-পুরুষকে বোঝায়, যাঁরা যুক্তির মাধ্যমে নারীর পক্ষালম্বন করেন। এই অর্থে রোকেয়া অবশ্যই নারীবাদী। কিন্তু তিনি কি নারীবাদী তত্ত্বদর্শন দ্বারা প্রভাবিত নারীবাদী ছিলেন, নাকি নারীবাদী তত্ত্বদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণ করেছেন—রোকেয়াকে বোঝার জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। এই মহিয়সী নারী বাইরের দেশে চালু নারীবাদী ভাবনার ছকচিত্রের মধ্য দিয়ে বাংলার নারীদের সমস্যাকে দেখেননি, বরং বঙ্গদেশের নারীসমাজকে প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে বিশ্ব নারীবাদী তত্ত্বদর্শনকে ঋদ্ধ করেছেন।[৩]

‘‘সুলতানার স্বপ্ন’’ সাহিত্যকর্মটি কি নারীবাদী: 
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার সুলতানার স্বপ্ন উপন্যাসটি ১৯০৫ সালে ইংরেজি ভাষায় রচনা করেন এবং ওই একই বছর মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন (The Indian Ladies' Magazine)-এ Sultana's Dream শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়।[০৪] বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে উপন্যাসটি বাংলায় প্রথম প্রকাশিত হয় সুলতানার স্বপ্ন নামে। উপন্যাসটিতে রোকেয়া এমন একটি দেশের কথা কল্পনা করেছেন যেটি হবে পুরুষ মুক্ত ল্যাডিল্যাণ্ড বা নারীস্থান। এই লেখাটিকে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ধ্রুপদী নারীবাদী কল্পকাহিনীর একটি আদিতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[০৫] বেগম রোকেয়া যে সময়ে সুলতার স্বপ্ন লিখেছেন সেই সময়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় এটিকে অত্যন্ত সাহসী ও বিপ্লবী সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়।[০৬]

উপন্যাসটিতে তিনি সমাজে নারী ও পুরুষের প্রচলিত ভূমিকাকে উল্টিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন নারীরা সমাজের যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রধান চালিকাশক্তি আর পুরুষেরা প্রায় গৃহবন্দী; যেমনটা তৎকালীন সময়ে নারীরা ছিল। রোকেয়ার কাল্পনিক ল্যাডিল্যাণ্ডের ধর্ম 'ভালোবাসা ও সত্যের', যেখানে কোন অপরাধ নেই।

উপন্যাসের শুরুর দিকে তিনি লিখেছেন, “আমি দিনের বেলায় এভাবে পথে বেড়াইতেছি! ইহা ভাবিয়া লজ্জায় জড়সড় হইলাম।” অর্থাৎ সে সময়ে দিনের বেলা নারীদের বাইরে বের হয়ে ঘুরে বেড়ানো ছিল নিষিদ্ধ এবং লজ্জার বিষয়। কিন্ত উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র সারার সঙ্গে কল্পনায় যখন নারীস্থানে লেখিকা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখনো তিনি বাস্তবতার ভয় পুরোপুরি কাটাতে পারেননি। তাই তার উক্তিতে কল্পনা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব দেখা যায়।

পুরুষ সমাজে যেমন অনেক ছেলেকে ‘মহিলা’ বলে অবজ্ঞা করা হয়। নারীস্থানে তেমনি ভগিনি সারারা অবজ্ঞার্থে বলেন, ‘‘...আপনি অনেকটা পুরুষ ভাবাপন্ন।” এমন বহু শ্লেষাত্মক বাক্য দ্বারা রোকেয়া তার সুলতানার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে বাস্তবের সমাজের ঘুম ভাঙানোর প্রয়াস নিয়েছেন।

‘‘রমণী স্বভাবতঃ দুর্ব্বলা, তাহাদের পক্ষে অন্তঃপুরের বাহিরে থাকা নিরাপদ নহে।”- ভারতবাসীর এমন মনোভাব উল্লেখ করে তিনি জবাব দিয়েছেন “হাঁ, নিরাপদ নহে ততদিন, যতদিন পুরুষজাতি বাহিরে থাকে!” অর্থাৎ বেগম রোকেয়া দেখাচ্ছেন নারীর অনিরাপত্তার জন্য নারী দায়ী নয় বরং তা পুরুষের দুর্বৃত্তপনার জন্য। লেখিকা এই অবস্থার সমালোচনা করেছেন এভাবে, “পুরুষেরা, যাহারা নানা প্রকার দুষ্টামী করে, বা অন্ততঃ করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্যি স্বাধীনতা ভোগ করে, আর নিরীহ কোমলাঙ্গী অবলারা বন্দিনী থাকে!”

অর্থাৎ যিনি/যারা সমস্যা সৃষ্টি করছেন তা(দের)কে শাস্তি না দিয়ে নিরাপরাধী(দের)কে শাস্তি দিচ্ছে সমাজ। তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে লিখেছেন, “বুদ্ধিমান লোককে বাতুলালয়ে আবদ্ধ রাখিয়া দেশের সমস্ত পাগলকে মুক্তি দেওয়াটা বোধ হয় আপনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন না?” উল্টো বিচারের এই সমাজ ব্যবস্থা দেখে লেখিকার উপলব্ধি “আমার বলিতে ইচ্ছা হয়, ‘দোষ কার, বন্দী হয় কে’!” আফসোস করে রোকেয়ার মন্তব্য, “উড়িতে শিখিবার পূর্ব্বেই আমাদের ডানা কাটিয়া দেওয়া হয়।”

আজ গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। যা এক সময় ছিল কল্পনা। সেই কল্পনা স্থান পেয়েছিল রোকিয়ার নারীবাদী স্বপ্নরাজ্য নারীস্থানে। “...অসংখ্য বালিকা স্কুল স্থাপিত হইল। এমন কি পল্লীগ্রামেও উচ্চশিক্ষার অমিয়-স্রোত প্রবাহিত হইল।” ভারতবর্ষে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯২৯ সালে।[০৭] যার পিছনে রোকেয়ার শক্ত অবস্থান ও ভূমিকা ছিল। ১৯০৫ সালেই সুলতানার স্বপ্নে রোকেয়া তার কল্পরাজ্যের শাসন ব্যবস্থার বর্ণনায় সে কথা তুলে ধরেছেন, ‘‘একুশ বৎসর বয়ঃক্রমের পূর্বে্ব কোন কন্যার বিবাহ হইতে পারিবে না- এই আইন হইলো।” শুধু তাই নয় তিনি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও তার এই লেখায় উল্লেখ করেছেন। ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি যেন তার সেই স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন।

রোকেয়ার কল্পনার জেনানা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষকেরা আত্মস্থ করেছেন বিজ্ঞানের অনেক রহস্যও। তারা সূর্যের তাপ সংগ্রহ, বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের মত অবিস্মরণীয় আবিষ্কারের সাফল্য দেখিয়েছেন। সুলতার স্বপ্নের সেই স্বপ্নও আজ ‘সৌর বিদ্যুৎ’ বাস্তব সত্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। পুরুষ দৈহিকভাবে শক্তিশালী তাই সে নারীর চেয় শ্রেষ্ঠ- এমন বদ্ধমূল ধারণার জবাব দিয়েছেন রোকেয়া, বলেছেন ‘‘হস্তীর মস্তিষ্কও ত মানবের তুলনায় বৃহৎ এবং ভারী, তবু ত মানুষ হস্তীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছে!”

রোকেয়ার নারীস্থানের সঙ্গে পার্শবর্তী দেশের যুদ্ধ শুরু হলে পুরুষযোদ্ধারা যখন নিশ্চিত পরাজয়ে জন্য প্রহর গুণছে তখন নারীরাই তুলে নেন যুদ্ধের ঝান্ডা। এই যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া অবরোধ প্রথার জাল ছিন্ন হয় এভাবে, “আমরা যুদ্ধযাত্রা করিবার পূর্বে্ব পুরুষদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করা উচিত। আমি পর্দ্দার অনুরোধে এই প্রার্থনা করি।” অর্থাৎ যেহেতু নারীদের পর্দা করতে হবে তাই পুরুষ যদি গৃহেবন্দী থাকে তবে নারীর বাইরে বিচরণ বা যুদ্ধযাত্রায় পর্দা লঙ্ঘন হবে না। সেই থেকে নারী স্থানে পুরুষরা গৃহবন্ধী আর নারীরা সমগ্র দেশ শাসন করে চলেছে সাফল্য-সাহসিকতার সাথে। আর এভাবেই নারীস্থানে ‘জেনানা প্রথা’র পরিবর্তে ‘মর্দ্দনা প্রথা’ চালু হয়।

এরপর থেকে নারীস্থানে কোন অপরাধ হয় নাই, কোন পুলিশেরও প্রয়োজন পরে নাই। কারণ হিসেবে রোকেয়া বলেছেন, ‘‘আপনারা স্বয়ং শয়তানকেই(পুরুষ জাতিকে) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, আর দেশে শয়তানী থাকিবে কিরূপে!” নারীস্থানের চমৎকার সব ব্যবস্থাপনা দেখে রোকেয়ার উপলব্ধি “ইহার নাম ‘সুখস্থান’ হয় নাই কেন?”

নারীস্থানের নারীরা যুদ্ধ করেছেন তাদের বিজ্ঞানীদের বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে। সূর্যের তাপ দিয়ে শত্রুকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তাড়িয়েছে, মেঘের পানিকে রেখেছিল অতিরিক্ত তাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। বিনা রক্তপাতে তাদের শান্তির জয় হয়। আর রোকেয়ার মানবতাবাদী কলমে ফুটে ওঠে, ‘‘কাহারও প্রাণনাশ করিতে অপর প্রাণীর কি অধিকার?”

নারীর ওজন জানা, নারীর দেশ ভ্রমণ বায়ুজানে উড্ডয়ন, নারীর রাজ্য শাসন ও রাজকর্ম সাধন- এসব কিছুকে সুলতার স্বপ্ন আকারে রোকেয়া তুলে ধরেছিলেন। এমনকি নারীদের মুক্তির আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে কল্পনা করা সেই নারীস্থান কোন অত্যাচারী (যারা নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখে) দেশের সঙ্গে তারা বাণিজ্য করে না। সর্বোপরি নারীস্থানের সমস্ত ‍দৃশ্য কল্পনা করে কিংবা ফুটিয়ে তুলে রোকেয়া তার ‘সাধের হিন্দুস্তানকে’ (ভারতবর্ষ) মন্তব্য করেছেন ‘মূর্খস্থান বলে।

সব মিলিয়ে, সুলতানার স্বপ্ন বইয়ে নারী পরিচালিত বৈচিত্র্যপূর্ণ, সমতাভিত্তিক কাল্পনিক নারীবিশ্বের চিত্র তুলে ধরেছেন, যা হবে শোষণ থেকে মুক্ত। অস্তিত্বের জন্য সুলতানার সংগ্রাম এবং নারীমুক্তির জন্য তার কাজ প্রভৃতি ছিল নারীবাদের উদাহরণ। রোকেয়া তার লেখনীর মধ্য দিয়ে সমাজের কুসংস্কার, অবরোধ প্রথার অতিরিক্ত প্রভাব, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, নারী শিক্ষা, নারীর প্রতি সামাজিক অবমাননা, নারীর অধিকার এবং নারী জাগরণের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন।[০৮] সুতরাং ‘‘সুলতানার স্বপ্ন’’ সাহিত্যকর্মটি নিঃসন্দেহে একটি নারীবাদী উপন্যাস।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার সাহিত্যকর্মে নারীর সমস্যা ও মুক্তির বিষয়টি যেভাবে ব্যক্ত করেছেন:

রোকেয়ার সাহিত্যচর্চার শুরু ১৯০২ সালে প্রকাশিত ‘পিপাসা’ শিরোনামে মহররম বিষয়ে একটি প্রবন্ধ এবং পদ্মরাগ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি রচনার মাধ্যমে। [০৯] রোকেয়ার নারীবাদী ভাবনার প্রথম প্রকাশ ঘটে তার লিকিত ‘অলংকার না badge of slavery' শীর্ষক দ্বিতীয় প্রবন্ধে (প্রকাশিত হয় মহিলা পত্রিকায়, ১৩১০)।[১০] বাঙালি মুসলিম নারীদের মুক্তি আন্দোলনের প্রবর্তন করেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।[১১]

এই আন্দোলন তিনি দুই ভাবে চালিয়েছেন। এক. তার লেখনী এবং  দুই. মাঠে সংগ্রাম (স্কুল প্রতিষ্ঠা)। রোকেয়া তার সংগ্রাম, তার চিন্তা এবং তার প্রতিবন্ধকতা সবটাই ফুটিয়ে তুলতেন তার সাহিত্যে। তার লেখনীতে তিনি নানা উদাহরণ, নানা যুক্তি দিয়ে নারীর জন্য লড়াই করেছেন। মুক্ত ও স্বাবলম্বী হতে হলে নারীকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এই উপলব্ধি থেকে রোকেয়া লিখে গেছেন, ‘‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক।”

তার সময়ে শিক্ষা নিতে আগ্রহী নারীদের সমাজ কোন চোখে দেখত তা তিনি তার ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘‘অশিক্ষিত স্ত্রীলোকের শত দোষ সমাজ অম্লানবদনে ক্ষমা করিয়া থাকে, কিন্তু সামান্য শিক্ষা প্রাপ্ত মহিলা দোষ না করিলেও সমাজ কোনো কল্পিত দোষ শতগুণ বাড়াইয়া সে বেচারীর ঐ ‘শিক্ষার’ ঘাড়ে চাপাইয়া দেয় এবং শতকণ্ঠে সমস্বরে বলিয়া থাকে ‘স্ত্রী শিক্ষা নমস্কার’।” [১২]

নারীর মুক্তি বা অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে রোকেয়া লড়ে গেছেন। সমাজ সংস্কার তথা নারী শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে গিয়ে তিনি যে তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তা তার জীবনীতে উঠে এসেছে। তিনি বলতেন- ‘‘যদি সমাজের কাজ করিতে চাও, তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে, যেন নিন্দা-গ্লানি, উপেক্ষা-অপমান কিছুই তাহাকে আঘাত করিতে না পারে, মাথার খুলিকে এমন মজবুত করিয়া লইতে হবে, যেন ঝড়-ঝঞ্চা, বজ্রবিদ্যুৎ সকলই তাহাতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে।” [১৩]

রোকেয়ার একটি সার্থক সৃষ্টি তার রচিত উপন্যাস পদ্মারাগ। উপন্যাসটির নায়িকা সিদ্দিকা এক অসম সাহসিকা নারী। পুরুষ শাসিত সমাজের কাছে ন্যায় বিচার লাভ করতে ব্যার্থ হয়ে সিদ্ধিকা সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলে: ‘‘আমি আজীবন...নারী জাতির কল্যাণ সাধনের চেষ্টা করিব এবং অবরোধ প্রথার মূলোচ্ছেদ করিব।...আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে, সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।”

রোকেয়া তার অন্যতম সেরা উপন্যাস ‘সুলতানার স্বপ্ন’-তে বাল্যবিয়ে বন্ধ, মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, মহিলা বিজ্ঞানী, নির্বাহী ক্ষমতাসহ রানী সর্বোপরি নারীদের জন্য স্বতন্ত্র দেশ নারীস্থানের স্বপ্ন দেখিয়েছেন ঘুমন্ত ভারতদুহিতাদের। রোকেয়া তার অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘কোন রোগীর চিকিৎসা করিতে হইলে প্রথমে রোগের অবস্থা জানা আবশ্যক। তাই অবলা জাতির উন্নতির পথ আবিষ্কার করিবার পূর্বে তাহাদের অবনতির চিত্র দেখাইতে হয়।...আমাদের একটা রোগ আছে দাসত্ব।...সেই রোগ হওয়ায় আমাদের সামাজিক অবস্থা কেমন বিকৃত হইয়াছে। ঔষধ পথ্যের বিধান স্থানান্তরে দেওয়া হইবে।” এক শতাব্দীকার পূর্বে তার দেওয়া সেই বিধান আজও নারী মুক্তির প্রতীক হয়ে আছে।

রোকায়ার লেখায় নারীর সমস্যা এবং সেই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়ও বর্ণিত হয়েছে। রোকেয়ার একটি কথা দিয়ে শেষ করব, যা নারীর সেই সময়কার অবহেলার চরম চিত্র এঁকেছে- ‘‘We have not got even athatched cottage as our own home. In the animal world no creature is as shelterless as we are. All have homes-only we have none."[14]

[০১] নারীবাদ- মাহমুদা ইসলাম, বাংলাপিডিয়া অনলাইন।
[০২] সাহিত্যে ‘নারীবাদ’- দেবদুলাল মুন্না (ঢাকা: বাতা২৪ ডট কম, প্রকাশ:  ২৫ নভেম্বর, ২০১৯)
[০৩] রোকেয়ার নারীবাদ, রোকেয়ার বিপ্লব -কুদরত-ই-হুদা (ঢাকা: প্রথম আলো অনলাইন, প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯)
[০৪] The manless world of Rokeya Sakhawat Hossain- Rafia ZakariaPublished (Pakistan: DAWN, 13 December, 2013)
[০৫] What happened to Arab science fiction? -Nesrine Malik (London, United Kingdom: The Guardian, 30 Jul, 2009)
[০৬] সুলতানার স্বপ্ন- উইকিপিডিয়া
[০৭] সুফিয়া কামাল- মালেকা বেগম, (ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ডিসেম্বর, ২০১৪) পৃষ্ঠা- ২০।
[০৮] নারীবাদ- মাহমুদা ইসলাম, বাংলাপিডিয়া অনলাইন।
[**] রোকেয়া-রচনাবলী- আব্দুল কাদির সম্পাদিত, (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, তৃতীয়  ‍পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ২০১৮) পৃষ্ঠা: ১০২-১১৭
[০৯] রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন- মালেকা বেগম, (ঢাকা: প্রথমা প্রকাশনী, মে ২০১৮) পৃষ্ঠা- ৩৪
[১০] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৫
[১১] উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলিম নারী রোকেয়ার নারীবাদ ও তার ধারাবাহিকতা- শাহানারা হোসেন, (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, জুন ২০১৪) পৃষ্ঠা- ৮৮
[১২] উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলিম নারী রোকেয়ার নারীবাদ ও তার ধারাবাহিকতা- শাহানারা হোসেন, (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, জুন ২০১৪) পৃষ্ঠা-
[১৩] রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন- মালেকা বেগম, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৮

আরও পড়ুন আপনার মতামত লিখুন

© Copyright -Bangla Runner 2024 | All Right Reserved |

Design & Developed By Web Master Shawon